1. যদি কোনো ব্যক্তি ইসলামের সঠিক বার্তা না পায়, তাহলে আখিরাতে তার বিচার কীভাবে হবে?
2. আল্লাহর ন্যায়বিচার এবং দুনিয়ায় নিরপরাধ মানুষের কষ্টের মধ্যে সম্পর্ক কী?
১ নং প্রশ্নঃ যদি কোনো ব্যক্তি ইসলামের সঠিক বার্তা না পায়, তাহলে আখিরাতে তার বিচার কীভাবে হবে?
জবাবঃ ইসলামের স্পষ্ট মূলনীতি অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তির কাছে যদি দ্বীনের সঠিক বার্তা না পৌঁছায়, তবে আল্লাহ তাআলা তার ওপর কোনো হুকুম বা বিধি-নিষেধ আরোপ করেন না এবং তাকে সরাসরি জাহান্নামিও সাব্যস্ত করেন না। এই বিষয়ে কুরআন ও হাদিসের অকাট্য দলিলগুলো নিচে উপস্থাপন করা হলো:
আল্লাহ তাআলা পরম ন্যায়বিচারক। বার্তা না পাঠিয়ে কাউকে শাস্তি না দেওয়া আল্লাহর একটি চিরন্তন নিয়ম।
দলিলঃ সূরা আল-ইসরা আয়াত ১৫
وَمَا كُنَّا مُعَذِّبِينَ حَتَّىٰ نَبْعَثَ رَسُولًا
“আর আমি কোনো রাসুল না পাঠানো পর্যন্ত কাউকেই শাস্তি দিই না।”
দলিলঃ সূরা আল-আনআম আয়াত ১৩১
ذَٰلِكَ أَن لَّمْ يَكُن رَّبُّكَ مُهْلِكَ الْقُرَىٰ بِظُلْمٍ وَأَهْلُهَا غَافِلُونَ
“এটা এ জন্য যে, তোমার প্রতিপালক কোনো জনপদের অধিবাসীদের তাদের অসচেতনতাবস্থায় অন্যায়ভাবে ধ্বংস করেন না।”
দলিলঃ সূরা আল-মুলক আয়াত ৮
تَكَادُ تَمَیَّزُ مِنَ الۡغَیۡظِ ؕ كُلَّمَاۤ اُلۡقِیَ فِیۡهَا فَوۡجٌ سَاَلَهُمۡ خَزَنَتُهَاۤ اَلَمۡ یَاۡتِكُمۡ نَذِیۡرٌ
قَالُوۡا بَلٰی قَدۡ جَآءَنَا نَذِیۡرٌ ۬ۙ فَكَذَّبۡنَا وَ قُلۡنَا مَا نَزَّلَ اللّٰهُ مِنۡ شَیۡءٍ ۚۖ اِنۡ اَنۡتُمۡ اِلَّا فِیۡ ضَلٰلٍ كَبِیۡرٍ
রোষে জাহান্নাম যেন ফেটে পড়বে, যখনই তাতে কোন দলকে নিক্ষেপ করা হবে, তাদেরকে রক্ষীরা জিজ্ঞেস করবে, তোমাদের কাছে কি কোন সতর্ককারী আসেনি?
তারা বলবে, হ্যাঁ, অবশ্যই আমাদের কাছে সতর্ককারী এসেছিল, তখন আমরা মিথ্যারোপ করেছিলাম এবং বলেছিলাম, আল্লাহ কিছুই নাযিল করেননি, তোমরা তো মহাবিভ্রান্তিতে রয়েছ।
এই আয়াত প্রমাণ করে, যাদের কাছে কোনো সতর্ককারী বা দাওয়াত পৌঁছায়নি, তাদের অপরাধ ছাড়াই জাহান্নামে দেওয়া হবে না।
দলিল: মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং: ১৬৩০১ (হাদিসের মান সহীহ)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাহাবি আসওয়াদ বিন সারী (রা.) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “কিয়ামতের দিন চার প্রকার ব্যক্তি (আল্লাহর দরবারে) নিজেদের ওজর বা অজুহাত পেশ করবে: ১. বধির ব্যক্তি— যে কিছুই শুনতে পেত না। ২. মানসিক প্রতিবন্ধী বা নির্বোধ ব্যক্তি। ৩. অতি বৃদ্ধ জরাজীর্ণ ব্যক্তি— যে বার্ধক্যের কারণে কিছুই বুঝতে পারত না। ৪. এমন ব্যক্তি— যে এমন যুগে বা স্থানে মারা গেছে যেখানে কোনো নবীর দাওয়াত পৌঁছায়নি।”
হাদিসের পরবর্তী অংশে বলা হয়েছে:
“তখন ইসলামের দাওয়াত না পাওয়া ব্যক্তিটি বলবে, ‘হে আমার রব! আপনার কোনো বার্তাবাহক আমার কাছে আসেনি।‘ অতঃপর আল্লাহ তাআলা তাদের কাছ থেকে এই মর্মে আনুগত্যের অঙ্গীকার (শপথ) নেবেন যে, তারা তাঁর আদেশ মেনে চলবে। এরপর তাদের কাছে নির্দেশ পাঠানো হবে যে— ‘তোমরা এই আগুনে প্রবেশ করো।‘ রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, যার হাতে আমার প্রাণ, তাঁর কসম! তারা যদি সেই আগুনে প্রবেশ করে, তবে আগুন তাদের জন্য শীতল ও শান্তিদায়ক হয়ে যাবে (এবং তারা জান্নাতে যাবে)। আর যারা (ভয়ে বা অহংকারে) নির্দেশ অমান্য করবে, তাদের টেনে জাহান্নামে নিয়ে যাওয়া হবে।”
ইসলামী আকীদা অনুযায়ী, প্রত্যেক মানুষ জন্মগতভাবেই একত্ববাদের সত্যতা বোঝার ন্যূনতম যোগ্যতা নিয়ে জন্মায়। ইসলামের দাওয়াত সরাসরি না পেলেও মানুষের বিবেক তাকে ভালো-মন্দের পার্থক্য এবং একজন সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বের জানান দেয়।
দলিল: সূরা আর-রূম, আয়াত ৩০
فَأَقِمْ وَجْهَكَ لِلدِّينِ حَنِيفًا ۚ فِطْرَتَ اللَّهِ الَّتِي فَطَرَ النَّاسَ عَلَيْهَا
“অতএব তুমি একনিষ্ঠভাবে নিজেকে দ্বীনের ওপর প্রতিষ্ঠিত রাখো। এটাই আল্লাহর প্রকৃতি (ফিতরাহ), যার ওপর তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন।”
দলিল: সহিহ বুখারীর হাদিস নং: ১৩৮৫
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
“প্রত্যেক নবজাতকই ‘ফিতরাহ’ (ইসলাম বা স্বভাবজাত সত্য)-এর ওপর জন্মগ্রহণ করে। অতঃপর তার পিতামাতা তাকে ইহুদি, খ্রিস্টান বা অগ্নিপূজক বানায়।”
তাই দাওয়াত না পাওয়া ব্যক্তি যদি তার এই জন্মগত স্বভাব (ফিতরাহ) অক্ষুণ্ন রেখে শিরক বা মূর্তিপূজা থেকে দূরে থাকে এবং এক আল্লাহর অস্তিত্বে মনে মনে বিশ্বাস রাখে, তবে সে আল্লাহর বিশেষ রহমত পাবে।
বিকৃত বা ভুলভাবে ইসলামের বার্তা পাওয়া ব্যক্তিদের বিধান
বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে পৃথিবীর প্রায় সব মানুষই ‘ইসলাম’ নামটির সাথে পরিচিত। কিন্তু অনেকের কাছেই ইসলামকে পৌঁছানো হয়েছে ‘সন্ত্রাসবাদ’ বা একটি ‘ভয়ানক ধর্ম’ হিসেবে। এই শ্রেণীর মানুষের বিচার কীভাবে হবে, তা নিয়ে স্কলারদের স্পষ্ট মতামত রয়েছে:
ইমাম গাজালী (রহ.)-বলেন: “তারা হলো এমন লোক, যাদের কাছে ইসলামের নাম পৌঁছেছে ঠিকই, কিন্তু এর সত্যতা বা সঠিক রূপ পৌঁছায়নি। বরং ছোটবেলা থেকেই তাদের শোনানো হয়েছে যে— মুহাম্মদ (সা.) একজন মিথ্যাবাদী ও ধোকাবাজ (নাউজুবিল্লাহ)। আমার দৃষ্টিতে এদের বিধানও প্রথম শ্রেণীর মতোই (অর্থাৎ যারা দাওয়াতই পায়নি)। আল্লাহ তাআলা এদেরকেও ক্ষমা করতে পারেন বা আখিরাতে পরীক্ষা নিতে পারেন। কারণ সত্যকে বিকৃতভাবে জানার কারণে সত্য অনুসন্ধান করার ইচ্ছা তাদের ভেতর মরে গেছে।”
শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহ.)-এর মতামত: তিনি উল্লেখ করেছেন, যে ব্যক্তির কাছে ইসলামের এমন কোনো বার্তা পৌঁছায়নি যার দ্বারা তার ওপর ‘হুজ্জাত’ (বা সত্যের প্রমাণ) কায়েম হয়, আল্লাহ তাকে রাসূলের অবাধ্যতার জন্য শাস্তি দেবেন না।
শায়খ বিন বাজ এর মতামত: পশ্চিমা বা অন্যান্য দেশের মিডিয়া ইসলামের যে বিকৃত রূপ প্রচার করে, তা দেখে কোনো অমুসলিম যদি ইসলাম থেকে দূরে থাকে, তবে সে ‘দাওয়াহ না পাওয়া’ ব্যক্তির সমতুল্য হতে পারে। কিয়ামতের দিন আল্লাহ তার ভেতরের সততা পরীক্ষা করবেন।
২ নং প্রশ্ন: আল্লাহর ন্যায়বিচার এবং দুনিয়ায় নিরপরাধ মানুষের কষ্টের মধ্যে সম্পর্ক কী?
জবাবঃ আল্লাহর ন্যায়বিচার এবং দুনিয়ায় নিরপরাধ মানুষের (যেমন শিশু, সৎ ব্যক্তি বা মজলুম) কষ্টের বিষয়টি ইসলামে অত্যন্ত গভীর এবং তাৎপর্যপূর্ণ। আপাতদৃষ্টিতে একে অবিচার মনে হলেও ইসলামের সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি, আখিরাত এবং বৃহত্তর কল্যাণের আলোকে এর পেছনে সুনির্দিষ্ট কারণ রয়েছে। নিচে এই সম্পর্কটি কুরআন ও হাদিসের আলোকে ব্যাখ্যা করা হলো:
ইসলাম অনুযায়ী, এই পৃথিবী মানুষের চিরস্থায়ী বাসস্থান বা চূড়ান্ত বিচারালয় নয়। এটি কেবলই একটি সাময়িক পরীক্ষাগার।
দলিলঃ সূরা আল-মুলক আয়াত ২
الَّذِي خَلَقَ المَوْتَ وَالحَيَاةَ لِيَبْلُوَكُمْ أَيُّكُمْ أَحْسَنُ عَمَلًا
“যিনি সৃষ্টি করেছেন মৃত্যু ও জীবন, যাতে তোমাদের পরীক্ষা করতে পারেন কে তোমাদের মধ্যে কর্মে শ্রেষ্ঠ?”
পরীক্ষা কক্ষে প্রশ্নপত্র কঠিন হওয়া যেমন শিক্ষকের অবিচার নয়, তেমনি দুনিয়ায় সৎ বা নিরপরাধ মানুষের কষ্ট পাওয়া আল্লাহর অবিচার নয়। এটি পরীক্ষারই একটি অংশ।
ইসলামে নিরপরাধ বা মুমিন ব্যক্তির প্রতিটি কষ্টের বিনিময়ে তার আত্মিক উন্নতি ও গুনাহ মাফের বিধান রয়েছে। এমনকি আল্লাহর সবচেয়ে প্রিয় মানুষ নবী-রাসূলগণ দুনিয়ায় সবচেয়ে বেশি কষ্ট পেয়েছেন।
দলিলঃ সহিহ বুখারীর হাদিস:
“মুসলিম ব্যক্তির ওপর যে কোনো ক্লান্তি, রোগ, উদ্বেগ, দুঃখ, কষ্ট বা উদ্বেগ আসুক না কেন, এমনকি তার গায়ে যদি একটি কাটাও ফোটে, তবে তার বিনিময়ে আল্লাহ তার গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেন।”
দুনিয়াতে মানুষের অনেক কষ্টের কারণ অন্য মানুষের অন্যায় বা জুলুম (যেমন যুদ্ধ, চুরি, অত্যাচার)। আল্লাহ মানুষকে ভালো ও মন্দ বাছাই করার ‘স্বাধীন ইচ্ছা’ দিয়েছেন।
দলিলঃ সূরা আশ-শূরা আয়াত ৩০
وَمَا أَصَابَكُم مِّن مُّصِيبَةٍ فَبِمَا كَسَبَتْ أَيْدِيكُمْ
“তোমাদের ওপর যে বিপদ-আপদ আসে, তা তোমাদেরই হাতের কামাই।”
মানুষের জ্ঞান অত্যন্ত সীমিত। আমরা একটি ঘটনার কেবল বর্তমান অবস্থা দেখি, কিন্তু আল্লাহ এর অতীত, বর্তমান এবং দূর ভবিষ্যৎ সবই জানেন। অনেক সময় যা আমাদের দৃষ্টিতে ‘কষ্ট’ বা ‘ক্ষতি’, তার আড়ালে অনেক বড় কল্যাণ লুকিয়ে থাকে।
খিজির (আ.) একটি নিষ্পাপ শিশুকে হত্যা করেছিলেন, যা আপাতদৃষ্টিতে চরম অন্যায় মনে হয়েছিল। কিন্তু পরে জানা যায়, সেই শিশুটি বড় হয়ে তার বাবা-মাকে চরম কষ্ট ও কুফরির দিকে ঠেলে দিত। আল্লাহ তাদের এর চেয়ে উত্তম সন্তান দেওয়ার জন্য এই ফয়সালা করেছিলেন।
দলিলঃ সূরা আল-বাকারাহ আয়াত ২১৬
وَعَسَىٰ أَن تَكْرَهُوا شَيْئًا وَهُوَ خَيْرٌ لَّكُمْ
“সম্ভবত তোমরা কোনো বিষয় পছন্দ করো না, অথচ তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর।”
দুনিয়ায় নিরপরাধ মানুষের কষ্ট আল্লাহর ইনসাফের ঘাটতি নয়, বরং এটি আল্লাহর মহাজাগতিক পরিকল্পনার একটি অংশ। এই কষ্টের নিখুঁত ও পরম ন্যায়বিচার হবে আখিরাতের আদালতে, যেখানে কোনো মজলুমের তিলপরিমাণ কষ্টও বৃথা যাবে না।
ISLAMIC DAWAH FOUNDATION The truth is revealed to Islam