Wednesday , September 23 2026

শিরক সম্পর্কে জানুন………

শিরক

আজ আমরা এমন এক স্পর্শকাতর এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে কথা বলতে যাচ্ছি, যা আমাদের ঈমান ও আখেরাতের মুক্তির সাথে সরাসরি জড়িত। বিষয়টি হলো—’শিরক’। এটি ইসলামের সবচেয়ে মারাত্মক অপরাধ, যা একজন মানুষের জীবনের সব নেক আমল এক নিমেষে ধ্বংস করে দেয়। 

সহীহ বুখারী হাদিস নম্বর- ২৬৫৪

أَبِيْ بَكْرَةَ عَنْ أَبِيْهِ قَالَ قَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم أَلَا أُنَبِّئُكُمْ بِأَكْبَرِ الْكَبَائِرِ ثَلَاثًا قَالُوْا بَلَى يَا رَسُوْلَ اللهِ قَالَ الْإِشْرَاكُ بِاللهِ وَعُقُوقُ الْوَالِدَيْنِ

আবূ বকর (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) একদা তিনবার বললেন, আমি কি তোমাদেরকে সবচেয়ে বড় কবীরা গুনাহগুলো সম্পর্কে অবহিত করব না? সকলে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! অবশ্যই বলুন। তিনি বললেন, আল্লাহর সঙ্গে শির্ক করা এবং পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া।

শিরক কী এবং কেন এটি মহাজুলুম?

‘শিরক’ শব্দের অর্থ হলো অংশীদার সাব্যস্ত করা। ইসলামী শরিয়তের পরিভাষায়, মহান আল্লাহর রুবূবিয়্যাত (প্রভুত্ব), উলূহিয়্যাত (ইবাদত) কিংবা তাঁর সুন্দর নাম ও গুণাবলীতে অন্য কাউকে শরিক বা সমকক্ষ মনে করাই হলো শিরক। 

আমরা যে পৃথিবীতে বাস করি, তার একজনই মাত্র স্রষ্টা। আমাদের সুখ-দুঃখ, জীবন-মৃত্যু, রিজিক—সবকিছুই আল্লাহর নিয়ন্ত্রণে। এই একক সত্তার সাথে অন্য কাউকে মেলানো এক চরম অকৃতজ্ঞতা। এ কারণেই পবিত্র কুরআনে শিরককে সবচেয়ে বড় জুলুম বলা হয়েছে। লোকমান হাকিম তাঁর সন্তানকে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেছিলেন: 

সূরা লোকমান, আয়াত: ১৩

یٰبُنَیَّ لَا تُشۡرِكۡ بِاللّٰهِ ؕؔ اِنَّ الشِّرۡكَ لَظُلۡمٌ عَظِیۡمٌ

“হে আমার প্রিয় বৎস! আল্লাহর সাথে কোনো শরিক করো না। নিশ্চয়ই শিরক হলো চরম জুলুম।”

শিরকের ভয়াবহতা

শিরকের অপরাধ কতটা ভয়ংকর, তা আল্লাহর ঘোষণা দেখলেই বোঝা যায়। আল্লাহ তাআলা মানুষের যেকোনো গুনাহ চাইলে ক্ষমা করতে পারেন, কিন্তু শিরকের গুনাহ তওবা ছাড়া কখনোই ক্ষমা করবেন না। 

আল্লাহর ক্ষমা না করার ঘোষণা:
সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৪৮

اِنَّ اللّٰهَ لَا یَغۡفِرُ اَنۡ یُّشۡرَكَ بِهٖ وَ یَغۡفِرُ مَا دُوۡنَ ذٰلِكَ لِمَنۡ یَّشَآءُ

“নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সাথে শরিক করাকে ক্ষমা করেন না। এ ছাড়া অন্যান্য পাপ যাকে ইচ্ছা তিনি ক্ষমা করেন।”

আমল বাতিলের চরম পরিণতি:
সূরা আজ-জুমার, আয়াত: ৬৫

وَ لَقَدۡ اُوۡحِیَ اِلَیۡكَ وَ اِلَی الَّذِیۡنَ مِنۡ قَبۡلِكَ ۚ لَئِنۡ اَشۡرَكۡتَ لَیَحۡبَطَنَّ عَمَلُكَ وَ لَتَكُوۡنَنَّ مِنَ الۡخٰسِرِیۡنَ

“আপনার প্রতি এবং আপনার পূর্ববর্তীদের প্রতি ওহী পাঠানো হয়েছে যে, যদি আপনি আল্লাহর সাথে শরিক করেন, তবে আপনার আমল অবশ্যই নিষ্ফল হবে এবং আপনি ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবেন।”

জান্নাত হারাম হওয়ার ঘোষণা:
সূরা আল-মায়েদাহ, আয়াত: ৭২

اِنَّهٗ مَنۡ یُّشۡرِكۡ بِاللّٰهِ فَقَدۡ حَرَّمَ اللّٰهُ عَلَیۡهِ الۡجَنَّۃَ وَ مَاۡوٰىهُ النَّارُ

“নিশ্চয়ই যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে শরিক করবে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাত হারাম করে দিয়েছেন এবং তার ঠিকানা হবে জাহান্নাম।”

সমসাময়িক সমাজে শিরকের রূপ

আজ আমাদের অজান্তেই সমাজে নানাভাবে শিরক ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকে না বুঝেই ঈমান হারাচ্ছেন: 

মাজার ও কবরকে কেন্দ্র করে শিরক:
আমাদের সমাজে কোনো কোনো মানুষ বিপদে পড়লে, সন্তান না হলে বা ব্যবসায় লোকসান হলে সোজা কোনো পীর বা মাজারের দিকে ছুটে যায়। সেখানে গিয়ে সিজদা করে, মানত করে এবং মৃত ব্যক্তির কাছে সন্তান বা রোগমুক্তি প্রার্থনা করে। অথচ দেওয়ার মালিক একমাত্র আল্লাহ। ডাক্তার যখন জবাব দিয়ে দেয়, তখনো মানুষ কবরে গিয়ে সন্তান চায়। এটি স্পষ্ট বড় শিরক।

সূরা আশ শুরা, আয়াত: ৪৯-৫০

لِلّٰهِ مُلۡكُ السَّمٰوٰتِ وَ الۡاَرۡضِ ؕ یَخۡلُقُ مَا یَشَآءُ ؕیَهَبُ لِمَنۡ یَّشَآءُ اِنَاثًا وَّ یَهَبُ لِمَنۡ یَّشَآءُ الذُّكُوۡرَ

اَوۡ یُزَوِّجُهُمۡ ذُكۡرَانًا وَّ اِنَاثًا ۚ وَ یَجۡعَلُ مَنۡ یَّشَآءُ عَقِیۡمًا ؕ اِنَّهٗ عَلِیۡمٌ قَدِیۡرٌ- 

আসমানসমূহ ও যমীনের রাজত্ব আল্লাহরই। তিনি যা চান সৃষ্টি করেন। তিনি যাকে ইচ্ছা কন্যা সন্তান দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা পুত্র সন্তান দান করেন অথবা তাদেরকে পুত্র ও কন্যা উভয়ই দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা বন্ধ্যা করেন। তিনি তো সর্বজ্ঞ, সর্বশক্তিমান।

সূরা ফাতির, আয়াত: ১৪

اِنۡ تَدۡعُوۡهُمۡ لَا یَسۡمَعُوۡا دُعَآءَكُمۡ ۚ وَ لَوۡ سَمِعُوۡا مَا اسۡتَجَابُوۡا لَكُمۡ ؕ وَ یَوۡمَ الۡقِیٰمَۃِ یَكۡفُرُوۡنَ بِشِرۡكِكُمۡ ؕ وَ لَا یُنَبِّئُكَ مِثۡلُ خَبِیۡرٍ

যদি তোমরা তাদেরকে ডাক, তারা তোমাদের ডাক শুনবে না; আর শুনতে পেলেও তোমাদের ডাকে সাড়া দেবে না এবং কিয়ামতের দিন তারা তোমাদের শরীক করাকে অস্বীকার করবে। আর সর্বজ্ঞ আল্লাহর ন্যায় কেউ তোমাকে অবহিত করবে না

লোহার আংটি, সুতা ও তাবিজের ওপর ভরসা:
অনেক ব্যবসায়ীকে দেখা যায় দোকানে বেচাকেনা ভালো হওয়ার জন্য বিশেষ কোনো পাথর বা আংটি পরে থাকেন। অনেক মা তার সন্তানের গলায় বা কোমরে কালো সুতা বা তাবিজ বেঁধে দেন যাতে ‘নজর’ না লাগে বা রোগ না হয়। একটু ভেবে দেখুন, একটা জড় পদার্থ, একটা সুতা বা ধাতুর টুকরো কীভাবে মানুষকে রক্ষা করতে পারে? রাসূলুল্লাহ (সা.) পরিষ্কার বলেছেন:

আবু দাউদ হাদিস নম্বর-৩৮৮৩ (হাদিসের মান সহীহ)

 عَنْ زَيْنَبَ، امْرَأَةِ عَبْدِ اللَّهِ عَنْ عَبْدِ اللَّهِ، قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: إِنَّ الرُّقَى، وَالتَّمَائِمَ، وَالتِّوَلَةَ شِرْكٌ

আব্দুল্লাহ (রাঃ)-এর স্ত্রী যাইনাব (রাঃ) আব্দুল্লাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছিঃ যাদু, তাবীজ ও অবৈধ, প্রেম ঘটানোর মন্ত্র শির্ক-এর অন্তর্ভুক্ত।

রাশিফল, জ্যোতিষী ও ভাগ্য গণনা:
পত্রিকায় বা ফেসবুকে প্রতিদিন অনেকে ‘আজকের রাশিফল’ পড়েন। অমুক রাশির জাতকদের আজ দুর্ঘটনা ঘটতে পারে, কিংবা লটারি জিততে পারে—এইসব কথায় বিশ্বাস করা। অনেকে আবার টিয়া পাখি দিয়ে ভাগ্য পরীক্ষা করায় বা জ্যোতিষীকে হাত দেখায়। অথচ অদৃশ্যের খবর একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানে না।

সূরা লোকমান, আয়াত: ৩৪

اِنَّ اللّٰهَ عِنۡدَهٗ عِلۡمُ السَّاعَۃِ ۚ وَ یُنَزِّلُ الۡغَیۡثَ ۚ وَ یَعۡلَمُ مَا فِی الۡاَرۡحَامِ ؕ وَ مَا تَدۡرِیۡ نَفۡسٌ مَّاذَا تَكۡسِبُ غَدًا ؕ وَ مَا تَدۡرِیۡ نَفۡسٌۢ بِاَیِّ اَرۡضٍ تَمُوۡتُ ؕ اِنَّ اللّٰهَ عَلِیۡمٌ خَبِیۡرٌ

নিশ্চয় আল্লাহর নিকট কিয়ামতের জ্ঞান রয়েছে। আর তিনি বৃষ্টি বর্ষণ করেন এবং জরায়ূতে যা আছে, তা তিনি জানেন। আর কেউ জানে না আগামীকাল সে কী অর্জন করবে এবং কেউ জানে না কোন্ স্থানে সে মারা যাবে। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সম্যক অবহিত।

আবু দাউদ হাদিস নম্বর-৩৯০৪ (হাদিসের মান সহীহ)

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: مَنْ أَتَى كَاهِنًا قَالَ مُوسَى فِي حَدِيثِهِ فَصَدَّقَهُ بِمَا يَقُولُ ثُمَّ اتَّفَقَا أَوْ أَتَى امْرَأَةً قَالَ مُسَدَّدٌ: امْرَأَتَهُ حَائِضًا أَوْ أَتَى امْرَأَةً قَالَ مُسَدَّدٌ: امْرَأَتَهُ فِي دُبُرِهَا فَقَدْ بَرِئَ مِمَّا أُنْزِلَ عَلَى مُحَمَّدٍ

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ কোনো ব্যক্তি গণকের নিকট গেলে (বর্ণনাকারী মূসা তার হাদীসে বলেন) এবং তার কথা বিশ্বাস করলে অথবা স্ত্রীর সাথে (মুসাদ্দাদের বর্ণনায় রয়েছে) ঋতুবতী স্ত্রীর সাথে সহবাস করলে অথবা স্ত্রীর সাথে পশ্চাৎ দ্বারে সহবাস করলে সে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উপর যা অবতীর্ণ হয়েছে, সে তা থেকে দায়মুক্ত (অর্থাৎ ইসলামের গন্ডির বাইরে)

লোকদেখানো ইবাদত বা রিয়া (ছোট শিরক):
বাস্তব জীবনের আরেকটি বড় ব্যাধি হলো ‘মানুষ কী বলবে’। যখন কেউ একা নামাজ পড়ে তখন হয়তো খুব দ্রুত শেষ করে, কিন্তু মসজিদে মানুষের সামনে পড়লে খুব সুন্দর ও ধীরস্থিরভাবে নামাজ পড়ে যাতে লোকে তাকে পরহেজগার বলে। দান করার পর ইন্টারনেটে ছবি বা ভিডিও আপলোড করে বাহবা পাওয়ার চেষ্টা করা।

মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নম্বর: ২৩৬৮১

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “আমি তোমাদের ওপর যে জিনিসটিকে সবচেয়ে বেশি ভয় পাই, তা হলো ছোট শিরক।” সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! ছোট শিরক কী? তিনি বললেন: “রিয়া (বা লোকদেখানো আমল)।” কিয়ামতের দিন যখন মানুষকে তাদের আমলের প্রতিদান দেওয়া হবে, তখন আল্লাহ বলবেন, “তোমরা দুনিয়াতে যাদের দেখানোর জন্য আমল করতে, তাদের কাছে যাও এবং দেখ তারা তোমাদের কোনো প্রতিদান দিতে পারে কি না।”

কথাবার্তায় শিরক:


আমরা না বুঝেই অনেকে বলি, “তুমি না থাকলে আজ আমার কী যে হতো!”, “ডাক্তার সাহেবই আমার জীবন বাঁচিয়েছেন”, কিংবা “আল্লাহ যা করেন, আর আপনি যা করেন”। এই কথাগুলো আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ মনে হলেও এগুলো মানুষের অজান্তেই আল্লাহর সমকক্ষ তৈরি করে ফেলে। বলতে হবে: “আল্লাহর রহমতে এবং ডাক্তারের উসিলায় আমি সুস্থ হয়েছি।”

শিরক থেকে মুক্তির উপায়

প্রিয় দ্বীনি ভাইয়েরা, এই মারাত্মক পাপ থেকে বাঁচতে হলে আমাদের তিনটি পদক্ষেপ নিতে হবে:
১. তাওহিদের সঠিক জ্ঞান অর্জন: আল্লাহকে তাঁর নাম, গুণ ও ইবাদতের ক্ষেত্রে একক হিসেবে জানা ও মানা।
২. অতীতের ভুলের জন্য খাঁটি তওবা: জীবনে জানা-অজানা যত শিরক হয়েছে, তার জন্য আল্লাহর কাছে অনুতপ্ত হয়ে ক্ষমা চাওয়া।
৩. রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর শেখানো দোয়া পড়া: নবীজী (সা.) সাহাবিদের এই দোয়াটি বেশি বেশি পড়তে বলেছেন: 

আল-আদাবুল মুফরাদ, হাদিস নম্বর: ৭২১

اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ أَنْ أُشْرِكَ بِكَ وَأَنَا أَعْلَمُ، وَأَسْتَغْفِرُكَ لِمَا لاَ أَعْلَمُ
হে আল্লাহ! আমি জেনে-শুনে আপনার সাথে শরিক করা থেকে আপনার কাছে আশ্রয় চাই এবং অজানা অবস্থায় হয়ে যাওয়া শিরকের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করছি।


আসুন, আমরা আমাদের চারপাশের অন্ধত্ব ও কুসংস্কার দূর করি। অন্তরকে খাঁটি তাওহিদের আলোয় আলোকিত করি। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে শিরকের অন্ধকার থেকে মুক্ত হয়ে খাঁটি মুমিন হিসেবে বেঁচে থাকার এবং ঈমানের সাথে মৃত্যুবরণ করার তৌফিক দান করুন। আমিন। 

About Md Nazmul Azam

I am website developer.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *