দ্বীন প্রতিষ্ঠার কাজ করা ঈমানি দায়িত্ব
ইমাম মাহদি ও হযরত ইসা আঃ আসার আগ পর্যন্ত সকলকে দ্বীন প্রতিষ্ঠার কাজ করা ইমানী দায়িত্ব।
যারা মনে করে যে,
দ্বীন হচ্ছে শুধু তাওহীদ, নামায, রোজা, যাকাত ইত্যাদি। এর সাথে রাজনীত তথা রাষ্ট্রব্যবস্থার কোন সম্পর্ক নেই। তাই রাজনীতি বা রাষ্ট্রব্যবস্থার সাথে ইকামাতে দ্বীনের কোন সম্পর্ক নেই। যারা রাষ্ট্রীয়ভাবে ইসলামকে প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তারা ইকামাতে দ্বীনের অর্থ বুঝেনি। তারা গোমরাহ। ইকামতে দ্বীন মানে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করা নয়, রাষ্ট্রীয়ভাবে আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠা করা নয়। কোন নবী রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিলো না। এমনি মুসা (আ.)ও না। লোহিত সাগরে ফেরাউন সলীল সমাধিস্থ হওয়ার পর তার পরিত্যক্ত শূন্য সিংহাসনের মুসা একদিনের জন্যও বসেন নি। এই হচ্ছে ইকামাতে দ্বীনের ব্যাপারে যাদের বক্তব্যের মূলকথা। আবার কেউ কেউ বলে ইমাম মাহদী ও ইসা আঃ এসে দ্বীন প্রতিষ্ঠা করবেন আমরা কেন করব?
.
কুরআন-হাদীস ও বাস্তবতার আলোকে উপরের তাদের এ বক্তব্য মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়। ইসলামের পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা সম্পর্কে যার নুন্যতম জ্ঞান আছে, এমন কোন ব্যক্তি এ রকম কথা বলতে পারে না। এটি স্পষ্টত ধৃষ্টতা, বিভ্রান্তি ও কুফুরী ছাড়া আর কিছুই নয়। কারণ: তার এ বক্তব্য কুরআন-সুন্নাহ ও বাস্তবতা পরিপন্থী। যেমন:
.
১. আল্লাহর বাণী:
ﻟَﻘَﺪْ ﺃَﺭْﺳَﻠْﻨَﺎ ﺭُﺳُﻠَﻨَﺎ ﺑِﺎﻟْﺒَﻴِّﻨَﺎﺕِ ﻭَﺃَﻧﺰَﻟْﻨَﺎ ﻣَﻌَﻬُﻢُ ﺍﻟْﻜِﺘَﺎﺏَ ﻭَﺍﻟْﻤِﻴﺰَﺍﻥَ ﻟِﻴَﻘُﻮﻡَ ﺍﻟﻨَّﺎﺱُ ﺑِﺎﻟْﻘِﺴْﻂِ ۖ ﻭَﺃَﻧﺰَﻟْﻨَﺎ ﺍﻟْﺤَﺪِﻳﺪَ ﻓِﻴﻪِ ﺑَﺄْﺱٌ ﺷَﺪِﻳﺪٌ ﻭَﻣَﻨَﺎﻓِﻊُ ﻟِﻠﻨَّﺎﺱِ ….
“আমরা আমাদের রাসূলগণকে প্রেরণ করেছি সুস্পষ্ট প্রমাণসহ এবং তাদের সাথে নাযিল করেছি কিতাব ও মিযান (দাড়িপাল্লা), যাতে লোকেরা ন্যায় বিচার করতে পারে। আমি লৌহ নাযিল করেছি, যাতে রয়েছে প্রচন্ড শক্তি ও মানুষের জন্য বহুবিধ কল্যাণ”
(সূরা আল-হাদীদ, আয়াত: ২৫)।
এ আয়াতে দাড়িপাল্লার মাধ্যমে যে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে, তা কি রাষ্ট্রব্যবস্থা ব্যতীত সম্ভব? এই প্রসঙ্গের সাথে লৌহের কি সম্পর্ক? তাও বুঝতে কষ্ট হওয়ার কথা নয়। এখানে লৌহ মানে রাষ্ট্রক্ষমতা/লৌহদন্ড। যার সাথে ন্যায়বিচারের সম্পর্ক রয়েছে।
.
২. আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা‘আলা সূরা আল-মায়িদার ৪৪, ৪৫, ৪৭ নং আয়াতে, যারা তাঁর নাযিলকৃত বিধান দিয়ে হুকুম/শাসন করে না, তাদেরকে কাফির, যালিম, ফাসিক বলে আখ্যায়িত করেছেন।
( ﻭَﻣَﻦ ﻟَّﻢْ ﻳَﺤْﻜُﻢ ﺑِﻤَﺎ ﺃَﻧﺰَﻝَ ﺍﻟﻠَّﻪُ ﻓَﺄُﻭﻟَٰﺌِﻚَ ﻫُﻢُ ﺍﻟْﻜَﺎﻓِﺮُﻭﻥَ )
( ﻭَﻣَﻦ ﻟَّﻢْ ﻳَﺤْﻜُﻢ ﺑِﻤَﺎ ﺃَﻧﺰَﻝَ ﺍﻟﻠَّﻪُ ﻓَﺄُﻭﻟَٰﺌِﻚَ ﻫُﻢُ ﺍﻟﻈَّﺎﻟِﻤُﻮﻥَ ))
( ﻭَﻣَﻦ ﻟَّﻢْ ﻳَﺤْﻜُﻢ ﺑِﻤَﺎ ﺃَﻧﺰَﻝَ ﺍﻟﻠَّﻪُ ﻓَﺄُﻭﻟَٰﺌِﻚَ ﻫُﻢُ ﺍﻟْﻔَﺎﺳِﻘُﻮﻥَ )
.
৩. সূরা আল-মায়িদার ৪৮ নং আয়াতে আল্লাহ বলছেন:
ﻓَﺎﺣْﻜُﻢ ﺑَﻴْﻨَﻬُﻢ ﺑِﻤَﺎ ﺃَﻧﺰَﻝَ ﺍﻟﻠَّﻪُ ۖ ﻭَﻟَﺎ ﺗَﺘَّﺒِﻊْ ﺃَﻫْﻮَﺍﺀَﻫُﻢْ ﻋَﻤَّﺎ ﺟَﺎﺀَﻙَ ﻣِﻦَ ﺍﻟْﺤَﻖِّ
অর্থাৎ (হে রাসূল,)আপনি আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তা দিয়ে বিচার-ফয়সালা/ শাসন করুন। আপনার কাছে যে সত্য এসেছে সে ব্যাপারে ওদের মনগড়া কথাবার্তার অনুসরণ করবেন না”।
৪. সূরা আল-মায়িদার ৪৯ নাং আয়াতেও বলা হয়েছে:
ﻭَﺃَﻥِ ﺍﺣْﻜُﻢ ﺑَﻴْﻨَﻬُﻢ ﺑِﻤَﺎ ﺃَﻧﺰَﻝَ ﺍﻟﻠَّﻪُ ﻭَﻟَﺎ ﺗَﺘَّﺒِﻊْ ﺃَﻫْﻮَﺍﺀَﻫُﻢْ
ﻭَﺍﺣْﺬَﺭْﻫُﻢْ ﺃَﻥ ﻳَﻔْﺘِﻨُﻮﻙَ ﻋَﻦ ﺑَﻌْﺾِ ﻣَﺎ ﺃَﻧﺰَﻝَ ﺍﻟﻠَّﻪُ ﺇِﻟَﻴْﻚَ ۖ“
“হে রাসূল, আপনি আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তা দিয়ে বিচার-ফয়সালা/ শাসন করুন। আপনার কাছে যে সত্য এসেছে সে ব্যাপারে ওদের মনগড়া কথাবার্তার অনুসরণ করবেন না। আল্লাহ আপনার উপর নাযিল করেছেন, তার কোন বিষয়ে যেন তারা আপনাকে ফিতনায় ফেলতে না পারে, সে ব্যাপারে সতর্ক থাকুন”।
.
৫. সূরা আননিসার ১০৫ নং আয়াতে আল্লাহ তাঁর নবীকে লক্ষ্য করে বলেন:
ﺇِﻧَّﺎ ﺃَﻧﺰَﻟْﻨَﺎ ﺇِﻟَﻴْﻚَ ﺍﻟْﻜِﺘَﺎﺏَ ﺑِﺎﻟْﺤَﻖِّ ﻟِﺘَﺤْﻜُﻢَ ﺑَﻴْﻦَ ﺍﻟﻨَّﺎﺱِ ﺑِﻤَﺎ ﺃَﺭَﺍﻙَ ﺍﻟﻠَّﻪُ ۚ ﻭَﻟَﺎ ﺗَﻜُﻦ ﻟِّﻠْﺨَﺎﺋِﻨِﻴﻦَ ﺧَﺼِﻴﻤًﺎ ( 105 )
“নিশ্চয়ই আমি তোমার উপর সত্যতার সাথে কিতাব নাযিল করেছি। যাতে করে তুমি আল্লাহ দেখিয়ে দেয়া বিধান দিয়ে লোকদের মধ্যে বিচার ফয়সালা করতে পার। আর তুমি বিশ্বাস ঘাতকদের পক্ষে ওকালতি করবে না”।
.
এসব আয়াত থেকে প্রমাণিত হয়ে যে, শাসনব্যবস্থায় ইসলাম প্রতিষ্ঠা করা বা ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠা করা আল্লাহর নির্দেশ, একটি ফরয ইবাদাত।
৬. আল্লাহ মানুষকে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন তাঁর খলীফা হিসেবে। যেমন আল্লাহ বলছেন:
ﺇِﻧِّﻲ ﺟَﺎﻋِﻞٌ ﻓِﻲ ﺍﻟْﺄَﺭْﺽِ ﺧَﻠِﻴﻔَﺔً “নিশ্চয়ই আমি পৃথিবীতে খলীফা সৃষ্টি করছি।” (আল-বাকারাহ:৩০)। ﻭَﻫُﻮَ ﺍﻟَّﺬِﻱ
ﺟَﻌَﻠَﻜُﻢْ ﺧَﻠَﺎﺋِﻒَ ﺍﻟْﺄَﺭْﺽِ ـ ﺍﻷﻧﻌﺎﻡ : 165 “তিনি তোমাদেরকে পৃথিবীতে খলীফা বানিয়েছেন”। (অাল-আন‘আম: ১৬৫)। আর এই খিলাফাতের দাবী হলো, ধর্মভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা।
এজন্যই আল্লাহ দাউদ (আ.) কে বলেছিলেন:
ﻳَﺎ ﺩَﺍﻭُﻭﺩُ ﺇِﻧَّﺎ ﺟَﻌَﻠْﻨَﺎﻙَ ﺧَﻠِﻴﻔَﺔً ﻓِﻲ ﺍﻟْﺄَﺭْﺽِ ﻓَﺎﺣْﻜُﻢ ﺑَﻴْﻦَ ﺍﻟﻨَّﺎﺱِ ﺑِﺎﻟْﺤَﻖِّ ﻭَﻟَﺎ ﺗَﺘَّﺒِﻊِ ﺍﻟْﻬَﻮَﻯٰ “হে দাউদ, আমি তোমাকে পৃথিবীতে খলীফা বানিয়েছি। অতএব, তুমি মানুষের মধ্যে সত্যতার সাথে বিচার-ফয়সালা কর। প্রবৃত্তির অনুসরণ করো না।” (সূরা সদ: ২৬)।
৭. নবীগণ (স.) দ্বীন ভিত্তিক সমাজ-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে ইকামাতে দ্বীন করেছেন। দাউদ (আ.) কথাতো একটু আগেই দেখলাম।
সহীহ বুখারী ও মুসলিমের সহীহ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে-
ﺃَﺑَﺎ ﺣَﺎﺯِﻡٍ ﻗَﺎﻝَ ﻗَﺎﻋَﺪْﺕُ ﺃَﺑَﺎ ﻫُﺮَﻳْﺮَﺓَ ﺧَﻤْﺲَ ﺳِﻨِﻴْﻦَ ﻓَﺴَﻤِﻌْﺘُﻪُ ﻳُﺤَﺪِّﺙُ ﻋَﻦْ ﺍﻟﻨَّﺒِﻲِّ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ ﻗَﺎﻝَ ﻛَﺎﻧَﺖْ ﺑَﻨُﻮْ ﺇِﺳْﺮَﺍﺋِﻴْﻞَ ﺗَﺴُﻮْﺳُﻬُﻢْ ﺍﻷَﻧْﺒِﻴَﺎﺀُ ﻛُﻠَّﻤَﺎ ﻫَﻠَﻚَ ﻧَﺒِﻲٌّ ﺧَﻠَﻔَﻪُ ﻧَﺒِﻲٌّ ﻭَﺇِﻧَّﻪُ ﻟَﺎ ﻧَﺒِﻲَّ ﺑَﻌْﺪِﻱْ ﻭَﺳَﻴَﻜُﻮْﻥُ ﺧُﻠَﻔَﺎﺀُ .
আবূ হাযিম (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি পাঁচ বছর যাবৎ আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ)-এর সাহচর্যে ছিলাম। তখন আমি তাঁকে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে হাদীস বর্ণনা করতে শুনেছি যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, বানী ইসরাঈলের নাবীগণ তাঁদের উম্মাতকে (আল্লাহ প্রদত্ত বিধান দ্বারা) শাসন করতেন। যখন কোন একজন নাবী মারা যেতেন, তখন অন্য একজন নাবী তাঁর স্থলাভিসিক্ত খলীফাহ হতেন। আর আমার পরে কোন নাবী নেই। তবে অনেক খলীফাহ্ হবে।
[সহীহ বুখারী, হাঃ৩৪৫৫ (আধুনিক প্রকাশনীঃ ৩১৯৭, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ৩২০৬) সহীহ মুসলিম হাঃ১৮৪২]
এই হাদীসে উল্লিখিত ﺗﺴﻮﺱ শব্দটি ﺳﻴﺎﺳﺔ সিয়াসাহ থেকে উদ্গত। যার অর্থই হলো, রাজনীতি। মুসা (আ.) এর ব্যাপারে যারা বলছেন, তিনি মিশরে যান নি; মিশরের রাষ্ট্রক্ষমতা পরিচালনা করেন নি। এ কথাটাও সর্বজন স্বীকৃত নয়। বরং কুরআনের একাধিক আয়াত থেকে বুঝা যায়, মুসা আ. তাঁর কওম বনী ইসরাইলকে নিয়ে মিশর গিয়েছিলেন এবং মিশরের শাসনক্ষমতা পরিচালনা করেছিলেন।
যেমন: সূরা আশ-শু‘আরাতে (আয়াত: ৫৭-৫৯)
.আল্লাহ বলছেন:
ﻓَﺄَﺧْﺮَﺟْﻨَﺎﻫُﻢ ﻣِّﻦ ﺟَﻨَّﺎﺕٍ ﻭَﻋُﻴُﻮﻥٍ ( 57 ) ﻭَﻛُﻨُﻮﺯٍ ﻭَﻣَﻘَﺎﻡٍ ﻛَﺮِﻳﻢٍ ( 58 ) ﻛَﺬَٰﻟِﻚَ ﻭَﺃَﻭْﺭَﺛْﻨَﺎﻫَﺎ ﺑَﻨِﻲ ﺇِﺳْﺮَﺍﺋِﻴﻞَ “তাদেরকে (ফেরাউন ও তার গোষ্ঠীকে) আমি বহিষ্কার করে দিলাম উদ্যানরাজি এবং প্রস্রবণ থেকে। তাদের ধনভান্ডার ও সুরম্য সৌধমালা থেকে। এ রকমই হয়েছিলো এবং বনী ইসরাইলকে এগুলোর উত্তরসূরী/অধিকারী বানিয়েছিলাম”।
সূরা আদ-দুখানে বলা হয়েছে (আয়াত: ২৫-২৮): ﻛَﻢْ ﺗَﺮَﻛُﻮﺍ ﻣِﻦ ﺟَﻨَّﺎﺕٍ ﻭَﻋُﻴُﻮﻥٍ ( 25 ) ﻭَﺯُﺭُﻭﻉٍ ﻭَﻣَﻘَﺎﻡٍ ﻛَﺮِﻳﻢٍ ( 26 ) ﻭَﻧَﻌْﻤَﺔٍ ﻛَﺎﻧُﻮﺍ ﻓِﻴﻬَﺎ ﻓَﺎﻛِﻬِﻴﻦَ ( 27 ) ﻛَﺬَٰﻟِﻚَ ۖ ﻭَﺃَﻭْﺭَﺛْﻨَﺎﻫَﺎ ﻗَﻮْﻣًﺎ ﺁﺧَﺮِﻳﻦَ
“তারা তাদের পশ্চাতে রেখে গেল কত উদ্যান ও প্রস্রবন! কত শষ্য খেত ও সুরম্য প্রাসাদসমূহ। কত বিলাস উপকরণ যা তাদেরকে আনন্দিত করত। এ রকমই হয়েছিল এবং আমি অন্য একটি জাতিকে এগুলোর অধিকারী বানিয়ে দিলাম”। যেহেতু, কুরআন কুরআনের ব্যাখ্যা। তাই এখানে অন্য একটি জাতি বলতে বনী ইসরাইলকে যে বোঝানো হয়েছে, তা সূরা শুআরা থেকেই প্রমাণিত। এ দ্বারা সুস্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে, বনী ইসরাইল মুসা
(আ. ) এর নেতৃত্বে অবার মিশরে গিয়েছিল
প্রখ্যাত গবেষক ড. মুহাম্মাদ হিযাযী আসসাকা বলছেন: ফেরাউন সলীল সমাধিস্থ হওয়ার পর মুসা আবার মিশরে গিয়েছিলেন এবং ১৩ বছর শাসন করেছিলেন। একাধিক উপাস্যের ধারণা বিলুপ্ত করেছিলেন, মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন। অতঃপর একজন গভর্ণর নিযুক্ত করে তিনি সিনাই মরুতে চলে যান। সেখান থেকে তাওরাত কিতাব লাভ করে এর একটি কপি ঐ গভর্ণরকে পাঠিয়ে দেন। তিনি সূরা ইউনুসের ৮৭ নং আয়াত দ্বারা এ মর্মে প্রমাণ পেশ করেন:
ﻭَﺃَﻭْﺣَﻴْﻨَﺎ ﺇِﻟَﻰٰ ﻣُﻮﺳَﻰٰ ﻭَﺃَﺧِﻴﻪِ ﺃَﻥ ﺗَﺒَﻮَّﺁ ﻟِﻘَﻮْﻣِﻜُﻤَﺎ ﺑِﻤِﺼْﺮَ ﺑُﻴُﻮﺗًﺎ ﻭَﺍﺟْﻌَﻠُﻮﺍ ﺑُﻴُﻮﺗَﻜُﻢْ ﻗِﺒْﻠَﺔً ﻭَﺃَﻗِﻴﻤُﻮﺍ ﺍﻟﺼَّﻠَﺎﺓَ ۗ ﻭَﺑَﺸِّﺮِ ﺍﻟْﻤُﺆْﻣِﻨِﻴﻦَ (87
“আমি মুসা ও তার ভাইকে এই মর্মে নির্দেশ দিলাম যে, তোমরা তোমাদের কওমের জন্য মিশরে আবাসস্থান বহাল রাখো। তোমাদের ঘরগুলোকে কিবলাহ তথা নামাযের জায়গা বানাও। আর নামায কায়িম কর। এবং মুমিনেদেরকে সুসংবাদ দাও”।
তাছাড়া, সূরা ‘আরাফের ১৩৭ নং আয়াত দিয়েও অনেকে প্রমাণ দিয়েছেন।
ﻭَﺃَﻭْﺭَﺛْﻨَﺎ ﺍﻟْﻘَﻮْﻡَ ﺍﻟَّﺬِﻳﻦَ ﻛَﺎﻧُﻮﺍ ﻳُﺴْﺘَﻀْﻌَﻔُﻮﻥَ ﻣَﺸَﺎﺭِﻕَ ﺍﻟْﺄَﺭْﺽِ ﻭَﻣَﻐَﺎﺭِﺑَﻬَﺎ ﺍﻟَّﺘِﻲ ﺑَﺎﺭَﻛْﻨَﺎ ﻓِﻴﻬَﺎ ۖ ﻭَﺗَﻤَّﺖْ ﻛَﻠِﻤَﺖُ ﺭَﺑِّﻚَ ﺍﻟْﺤُﺴْﻨَﻰٰ ﻋَﻠَﻰٰ ﺑَﻨِﻲ ﺇِﺳْﺮَﺍﺋِﻴﻞَ ﺑِﻤَﺎ ﺻَﺒَﺮُﻭﺍ ۖ ﻭَﺩَﻣَّﺮْﻧَﺎ ﻣَﺎ ﻛَﺎﻥَ ﻳَﺼْﻨَﻊُ ﻓِﺮْﻋَﻮْﻥُ ﻭَﻗَﻮْﻣُﻪُ ﻭَﻣَﺎ ﻛَﺎﻧُﻮﺍ ﻳَﻌْﺮِﺷُﻮﻥَ ( 137 )
“যে জাতিকে দুর্বল ও হীন ভাবা হত আমি তাদেরকে আমার কল্যাণপ্রাপ্ত রাজ্যের পূর্ব ও পশ্চিমের উত্তরাধিকারী বানাই, আর বনী ইসরাঈল জাতি সম্পর্কে তেমার রবের শুভ ও কল্যাণময় বাণী (প্রতিশ্রুতি) পূর্ণ হল যেহেতু তারা ধৈর্য ধারণ করেছিল। আর ফেরাউনও তার সম্প্রদায়ের কীর্তিকলাপ ও উচ্চ প্রাসাদসমূহকে আমি ধ্বংসস্তুপে পরিণত করেছি”।
অনেক তাফসীরকারক পূর্ব ও পশ্চিম বলতে, শাম, মিশর এসবকে বোঝানো হয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন। উল্লেখ্য যে, উপরিউক্ত আয়াতগুলো থেকে এটাও বোঝা যায় যে, আল-আরদুল মুকাদ্দাসাহ অভিযান ও তৎপরবর্তী তীহের ঘটনাগুলো পরে ঘটেছিল।
.
৮. ইমাম আহমাদ ও বাযযার কর্তৃক বর্নিত নিম্নোক্ত হাদীস থেকেও প্রমাণিত হয় যে, রাষ্ট্রব্যবস্থায় ইসলাম প্রতিষ্ঠা ইকামাতে দ্বীনেরই অংশ।
ﻋﻦ ﺟﺎﺑﺮ : ﺃﻥ ﺍﻟﻨﺒﻲ ـ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ ـ ﻗﺎﻝ ﻟﻜﻌﺐ ﺑﻦ ﻋﺠﺰﺓ : ” ﺃﻋﺎﺫﻙ ﺍﻟﻠﻪ ﻣﻦ ﺇﻣﺎﺭﺓ ﺍﻟﺴﻔﻬﺎﺀ ﻳﺎ ﻛﻌﺐ . ﻗﺎﻝ : ﻭﻣﺎ ﺇﻣﺎﺭﺓ ﺍﻟﺴﻔﻬﺎﺀ؟ ﻗﺎﻝ : ﺃﻣﺮﺍﺀ ﻳﻜﻮﻧﻮﻥ ﺑﻌﺪﻱ ، ﻻ ﻳﻬﺪﻭﻥ ﺑﻬﺪﻳﻲ ، ﻭﻻ ﻳﺴﺘﻨﻮﻥ ﺑﺴﻨﺘﻲ ، ﻓﻤﻦ ﺻﺪﻗﻬﻢ ﺑﻜﺬﺑﻬﻢ ، ﻭﺃﻋﺎﻧﻬﻢ ﻋﻠﻰ ﻇﻠﻤﻬﻢ ، ﻓﺄﻭﻟﺌﻚ ﻟﻴﺴﻮﺍ ﻣﻨﻲ ، ﻭﻟﺴﺖ ﻣﻨﻬﻢ ، ﻭﻻ ﻳﺮﺩﻭﻥ ﻋﻠﻰ ﺣﻮﺿﻲ ، ﻭﻣﻦ ﻟﻢ ﻳﺼﺪﻗﻬﻢ ﺑﻜﺬﺑﻬﻢ ، ﻭﻟﻢ ﻳﻌﻨﻬﻢ ﻋﻠﻰ ﻇﻠﻤﻬﻢ ، ﻓﺄﻭﻟﺌﻚ ﻣﻨﻲ ، ﻭﺃﻧﺎ ﻣﻨﻬﻢ ، ﻭﺳﻴﺮﺩﻭﻥ ﻋﻠﻰ ﺣﻮﺿﻲ .” ( ﺃﺣﻤﺪ ، ﺍﻟﺒﺰﺍﺭ ).
“হযরত যাবির (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসূলে কারীম স. কা’ব বিন আজুযাহকে বললেন: হে কা’ব আল্লাহ তায়ালা তোমাকে নির্বোধ লোকদের শাসন থেকে হেফাজাত করুন। তিনি আরজ করলেন, নির্বোধদের শাসন কি? রাসূলে কারীম স. বললেন: আমার পরে এমন কিছু শাসক আসবে, যারা আমার পথনির্দেশনা বা হিদায়াতকে গ্রহণ করবে না। আমার সুন্নাতের অনুকরণ করবে না। অতএব, যারা তাদের মিথ্যাচারকে বিশ্বাস করবে, জুলুম-অত্যাচার চালাতে তাদেরকে সাহায্য করবে, তাদের সাথে আমার, আমার সাথে তাদের কোন সম্পর্ক নেই। তারা আমার হাওজের কাছে আসতে পারবে না। আর যারা তাদের মিথ্যাচারকে প্রত্যাখ্যান করবে এবং তাদেরকে জুলুমের ব্যাপারে সাহায্য করবে না, তারা আমার, আমি তাদের অন্তর্ভুক্ত। তারা পরকালে আমার হাওজের কাছে স্থান পাবে”- (আহমাদ, বাজ্জার)।
.
৯. আল্লাহর বাণী: ﺃﻥ ﺃَﻗِﻴﻤُﻮﺍ ﺍﻟﺪِّﻳﻦَ ﻭَﻟَﺎ ﺗَﺘَﻔَﺮَّﻗُﻮﺍ ﻓِﻴﻪِ ۚ “তোমরা দ্বীন কায়িম কর। এ ব্যাপারে মতানৈক্য করো না”। (সূরা আশশুরা, আয়াত: ১৩)।
এখানে দ্বীন বলতে শুধু নামায-রোযা কে বোঝানো হয়নি। পরিপূর্ণভাবে ইসলামকে বোঝানো হয়েছে। এ জন্যই এই আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম আসসাআদী বলছেন:
ﻗﺎﻝ : ﺃﻥ ﺃﻗﻴﻤﻮﺍ ﺍﻟﺪﻳﻦ ﺃﻱ : ﺃﻣﺮﻛﻢ ﺃﻥ ﺗﻘﻴﻤﻮﺍ ﺟﻤﻴﻊ ﺷﺮﺍﺋﻊ ﺍﻟﺪﻳﻦ ﺃﺻﻮﻟﻪ ﻭﻓﺮﻭﻋﻪ ، ﺗﻘﻴﻤﻮﻧﻪ ﺑﺄﻧﻔﺴﻜﻢ ، ﻭﺗﺠﺘﻬﺪﻭﻥ ﻓﻲ ﺇﻗﺎﻣﺘﻪ ﻋﻠﻰ ﻏﻴﺮﻛﻢ ،
“অর্থাৎ আল্লাহ তোমাদেরকে আদেশ করছেন তোমরা যেন দ্বীনের উছুল (মৌলিক শিক্ষাগুলো) ও ফুরু (শাখা-প্রশাখা) সবকিছুই প্রতিষ্ঠা কর। দ্বীনি কয়িম করবে নিজেদের জীবনে। সর্ব শক্তি দিয়ে চেষ্ট করবে অন্যদের জীবনে বাস্তবায়নে…।”
এ কথা সত্যি যে, নবীদের আনীত শরীয়তসমূহের মধ্যে কিছুটা ব্যবধান ছিল। তবে মৌলিক আকীদাহ ও আখলাকসম্পর্কিত বিধানের মধ্যে কোন পার্থক্য ছিল না। তাই এখানে ইকামাতে দ্বীন বলতে প্রত্যেক নবীকে প্রদত্ত জীবনব্যবস্থা বা শরীয়ত কায়েম করা বোঝানো হয়েছে। আল্লাহ বলছেন:
ﻟِﻜُﻞٍّ ﺟَﻌَﻠْﻨَﺎ ﻣِﻨْﻜُﻢْ ﺷِﺮْﻋَﺔً ﻭَﻣِﻨْﻬَﺎﺟﺎً } ﺍﻟﻤﺎﺋﺪﺓ : 48 }
(আমি প্রত্যেকের জন্য আলাদা আলাদা শরীয়ত ও জীবন ব্যবস্থা দিয়েছি”। (সূরা অাল-মায়ীদাহ: ৪৮)।
.
যেহেতু, আমরা শেষ নবী মুহাম্মাদুর রসুলুল্লাহর (স.) এর উম্মত তাই আমাদের ক্ষেত্রে তাঁর শরীয়তই প্রযোজ্য। দ্বীনের ব্যাপকতা সম্পর্কে ড. আব্দুল কারীম যাইদান বলছেন: ইসলামের গোটা শিক্ষা তিনভাগে বিভক্ত:
ক. আকীদাহ সংক্রান্ত বিধিবিধান।
খ. আখলাক সংক্রান্ত বিধিবিধান।
গ. ব্যবহারিক বিধান বলা হয়।
এই তৃতীয় প্রকার আবার দুই ভাগে বিভক্ত:
ক. ইবাদাত: যে সব বিধিবিধান স্রষ্টা ও সৃষ্টির মধ্যকার সম্পর্ক বিন্যাস করে।
খ. মু‘আমালাহ: যে সকল বিধান সৃষ্টির /মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক বিন্যাস করে। এ গুলো আবার অনেক প্রকার:
১. পরিবারের সাথে সম্পৃক্ত বিধিবিধান। যেগুলোকে আধুনিক আইনের ভাষায় বলা হয়: পারসোনাল স্টেইটাস ল’/ফেমিলি ল’।
২. অর্থনৈতিক লেনদেন সংক্রান্ত বিধিবিধান। যেগুলোকে বলা হয়: সিভিল ল’।
৩. বিচার ব্যবস্থার সাথে সম্পৃক্ত বিধিবিধান। যেগুলোকে বলা হয়: ল’ অব প্রসিজিউর।
৪. মুসলিম রাষ্ট্রে বসবাসরত অমুসলিমদের সাথে সম্পর্ক বিন্যাসকারী ল’। যাকে বলা হয় প্রাইভেট ইনটারন্যাশনাল ল’।
৫. অন্যান্য রাষ্ট্রের সাথে ইসলামী রাষ্ট্রের সম্পর্ক বিষয়ক আইন। যাকে বলা হয়: পাবলিক ইনটারন্যাশনাল ল’।
৬. রাষ্ট্র ব্যবস্থা, রাষ্ট্রের ধরন, মূলনীতি, নাগরিক অধিকার, রাষ্ট্র ও জনগণের পারস্পরিক অধিকার ও কর্তব্য সংক্রান্ত আইন। যাকে বলা হয়: কনস্টিটিউশনাল ল’।
৭. অপরাধ ও দন্ডবিধি সংক্রান্ত আইন। যাকে বলা হয় পেনাল কোড/ফৌজদারী আইন। মোট কথা, জীবনের এমন কোন দিক নেই, যেখানে ইসলামের শাসন, অনুশাসন, বিধি-বিধান ও নির্দেশনা নেই। এই সব কিছু নিয়েই ইসলাম ও দ্বীন। তাই ইসলাম মানে শুধু কালেমা, নামায , যাকাত নয় এর সাথে রাষ্ট্রের কোন সম্পর্ক নেই। এ কথা নাস্তিকদের মুখে শোভা পায়।
৮.মুহাম্মাদুর রসুলুল্লাহ (স.) হচ্ছেন আমাদের আদর্শ। আমরা তার উম্মাত। তাঁর জীবনধারাই হলো বাস্তব ইসলাম। রাসূলের সুন্নাত তথা জীবনধারা অস্বীকারকারীদের দ্বারা ইকামাতে দ্বীনে হবে না। কারণ সেখানেতো দ্বীনই থাকবে না। আর এ কথা স্বতঃসিদ্ধ রাসূল (স. ) দশ বছর একটি রাষ্ট্রের রাষ্প্রপ্রধান ছিলেন। তিনি আল্লাহর কুরআন দিয়ে তা পরিচালনা করেছিলেন। তাহলে কি তিনি ইকামাতে দ্বীন করেন নি?
.
৯.. শরীয়তের নীতি হলো: ﻣﺎ ﻻ ﻳﺘﻢ ﺍﻟﻮﺍﺟﺐ ﺇﻻ ﺑﻪ ﻓﻬﻮ ﻭﺍﺟﺐ “ওয়াজিব পালন করতে যা অপরিহার্য, তাও ওয়াজিব। আর আমরা জানি, কুরআনের মধ্য এমন অনেক বিধান রয়েছে, যা একমাত্র রাষ্ট্রই বাস্তবায়ন করতে পারে। যেমন, হুদুদ, কিসাস, বেনামাযির শাস্তি, ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা। তাছাড়া, যাকাত ব্যবস্থাপনাও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। ইসলামী আদর্শে অবিশ্বাসীরা অবশ্যেই যিনার হদ্দ, কতলের কিসাস বাস্তবায়ন করবে না।
.
১০. সিংহাসন, রাষ্ট্রক্ষমতা, মসনদ বসার জন্য নয়; বরং আল-কুরআনকে ক্ষমতায় বসানোর জন্যই ইকামাতে দ্বীন। এর অর্থ: শুধুমাত্র রাজনীতিই ইকামাতে দ্বীন, তা নয়। বরং ব্যক্তি পর্যায়, পারিবারিক পর্যায়, সমাজ পর্যায়, রাষ্ট্র পর্যায় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ইসলাম প্রতিষ্ঠাই হচ্ছে ইকামাতে দ্বীন। এভাবেই ইসলামকে চূড়ান্ত বিজয়ী করাই হলো ইকামাতে দ্বীন। আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা‘আলা বলেন:
ﻫُﻮَ ﺍﻟَّﺬِﻱ ﺃَﺭْﺳَﻞَ ﺭَﺳُﻮﻟَﻪُ ﺑِﺎﻟْﻬُﺪَﻯٰ ﻭَﺩِﻳﻦِ ﺍﻟْﺤَﻖِّ ﻟِﻴُﻈْﻬِﺮَﻩُ ﻋَﻠَﻰ ﺍﻟﺪِّﻳﻦِ ﻛُﻠِّﻪِ ﻭَﻟَﻮْ ﻛَﺮِﻩَ ﺍﻟْﻤُﺸْﺮِﻛُﻮﻥَ
“ তিনিই তাঁর রাসূল কে পাঠিয়েছেন হিদায়াত ও সত্যদ্বীন সহ, যাতে করে তিনি সমস্ত বাতিল দ্বীনের উপর ইসলামকে বিজয়ী করতে পারেন। যদিও তা মুশরিকদের পছন্দ নয়”।
(সূরা তাওবাহ:৩৩, সফঃ০৯)।
আবার অনেকে মনে করে যে,আল কোরআনের বিধান শেষ নবী হযরত মোহাম্মদ সাঃ মক্কা বিজয় ও বিদায় হজ্বের ভাষনের মাধ্যমে পরিপূর্ণভাবে প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। এখন আর দরকার নেই। কেয়ামতের পূর্বে ইমাম মাহদী এসে অথবা হযরত ইসা আঃ পূনরায় এসে দ্বীন প্রতিষ্ঠ করবেন।
তাদের প্রশ্নের কিছু উত্তরঃ
রাসুল সাঃ এর মৃত্যুর পর থেকে আবুবকর, ওমর, ওসমান ও আলী রাঃ এর শামনামলের মত বাংলাদেশ সহ বিশ্বের কোনো দেশে কি বর্তমানে শাসন ব্যবস্থা আছে বা চলছে? যদি উত্তর না হয়, তবে ইমাম মাহদি ও ইসা আঃ এর আসার আগ পর্যন্ত আমরা যারা মোসলমান ও রাসুলের উম্মত দাবি করি আমাদেরকে পূনরায় পরিপূর্ণভাবে মদীনার রাষ্ট্রের মত শাসন ব্যবস্থায় নিজ নিজ সমাজ ও দেশকে ফিরিয়ে আনার সর্বোচ্চ চেষ্টা ও কলাকৌশল অবলম্বন করতে হবে। এ কারনেই মহান আল্লাহ তায়ালা উপরে বর্ণিত আয়াতে কারিমা পবিত্র কোরআনে বর্ণনা করেছেন। আমরা আমরা আমাদের সকল সাধ্যমোতাবেক চেষ্টা করতে থাকব। ইমাম মাহদি ও ইসা আঃ এর আগমনের আগে পরিপূর্ণ হলেত আলহামদুলিল্লাহ। আর সর্বোচ্চ চেষ্টা করা সত্তেও যদি না হয় তবে বাকি কাজ ইমাম মাহদি ও ইসা আঃ এসে পরিপূর্ণতা দিবেন। আর যদি আমরা বর্তমানে দ্বীন প্রতিষ্ঠার চেষ্টা নাই করি তবে বর্তমানে যতটুকুই আছে এতটুকুও আর থাকবেনা। কারন বাতিল শক্তিরা বাংলাদেশ সহ বিশ্বব্যাপী ইসলামের বিপক্ষে ষড়যন্ত্র লিপ্ত আছে ও তারা ইসলামকে চিরতরে নির্মুল করতে সর্বদিক থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করতেছে। আর ইমাম। ইমাম মাহদি ও ইসা আঃ এর আসার অজুহাত দিয়ে যদি কাজ না করে আমাদের ব্যক্তিগত জীবন যতটুকু আল্লাহর বিধান মেনে চলতে সরকার বাধা দেয়না ততটুক মেনে চলি তাহলে আল কোরআনের কিছু নির্দেশনা তাও আমাদের সুবিধাত মানা হলো।
আল্লাহর কিছু আয়াত বা নির্দেশনা মানব আর বাকিগুলো মানব না। এটা মুমিনের কাজ হতে পারে না। ইমাম মাহদি ও ইসা আঃ এর কথা বলে নিজেকে কেবল মাত্র ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে যতটুকু দরকার ততটুকু আল্লাহর আদেশ মানব আর সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে আল্লাহর আইন চালু করার চেষ্টা থেকে বিরত রাখব সেটাও হতে পারেনা। এ প্রসঙ্গে আল্লাহর বাণী-
সুরা আল বাকারার ৮৫ নাম্বার আয়াতের শেষাংশ-
أَفَتُؤۡمِنُونَ بِبَعۡضِ ٱلۡكِتَٰبِ وَتَكۡفُرُونَ بِبَعۡضࣲۚ فَمَا جَزَآءُ مَن يَفۡعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمۡ إِلَّا خِزۡيࣱ فِي ٱلۡحَيَوٰةِ ٱلدُّنۡيَاۖ وَيَوۡمَ ٱلۡقِيَٰمَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰٓ أَشَدِّ ٱلۡعَذَابِۗ وَمَا ٱللَّهُ بِغَٰفِلٍ عَمَّا تَعۡمَلُونَ
তবে কি তোমরা কিতাবের (অর্থাৎ তাওরাতের) কিছু অংশে ঈমান রাখ এবং কিছু অংশ অস্বীকার কর? তাহলে বল, তোমাদের মধ্যে যারা এরূপ করে তাদের শাস্তি এ ছাড়া আর কী হতে পারে যে, পার্থিব জীবনে তাদের জন্য থাকবে লাঞ্ছনা আর কিয়ামতের দিন তাদেরকে নিয়ে যাওয়া হবে কঠিনতর আযাবের দিকে? তোমরা যা-কিছু কর আল্লাহ সে সম্পর্কে উদাসীন নন।
আন নিসা ৪:১৫০ ও ১৫১ নং আয়াত।
إِنَّ ٱلَّذِينَ يَكۡفُرُونَ بِٱللَّهِ وَرُسُلِهِۦ وَيُرِيدُونَ أَن يُفَرِّقُواْ بَيۡنَ ٱللَّهِ وَرُسُلِهِۦ وَيَقُولُونَ نُؤۡمِنُ بِبَعۡضࣲ وَنَكۡفُرُ بِبَعۡضࣲ وَيُرِيدُونَ أَن يَتَّخِذُواْ بَيۡنَ ذَٰلِكَ سَبِيلًا
أُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلۡكَٰفِرُونَ حَقࣰّاۚ وَأَعۡتَدۡنَا لِلۡكَٰفِرِينَ عَذَابࣰا مُّهِينࣰا
যারা আল্লাহ্কে অস্বীকার করে ও তাঁর রাসূলদেরকেও এবং আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের মধ্যে ঈমানের ব্যাপারে তারতম্য করতে চায় আর বলে, ‘আমরা কতককে বিশ্বাস করি ও কতককে অবিশ্বাস করি’; আর তারা মধ্যবর্তী কোন পথ অবলম্বন করতে চায়,
এরাই প্রকৃত কাফির, এবং কাফিরদের জন্যে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি প্রস্তুত রেখেছি।
এছাড়াও মহান আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে মুমিনদেরকে আল্লাহর সাথে শরিক করতে নিষেধ করেছেন। আর কেয়ামতের দিনে আল্লাহ সব গুনাহ তিনি মাফ করে দিতে পারেন কিন্তু আল্লাহর সাথে শিরক করা ও কারো হক নষ্ট করা ক্ষমা করবেন না। সে ব্যাপারে কোরআন ও হাদীসে অনেক আলোচনা আছে।
রাষ্ট্রব্যবস্থায় ইসলামকে অস্বীকার করা শিরক পর্যায়ের অপরাধ।
পবিত্র কুরআনে যখন বলা হলো:
ﺍﺗَّﺨَﺬُﻭﺍ ﺃَﺣْﺒَﺎﺭَﻫُﻢْ ﻭَﺭُﻫْﺒَﺎﻧَﻬُﻢْ ﺃَﺭْﺑَﺎﺑًﺎ ﻣِّﻦ ﺩُﻭﻥِ ﺍﻟﻠَّﻪِ
“তারা (ইয়াহুদ ও খ্রীস্টানগণ) আল্লাহ কে বাদ দিয়ে তাদের ধর্মযাজক ও পুরোহিতদেরকে রব বানিয়েছে” (সূরা আততাওবাহ: ৩১)।
তখন আদী বিন হাতিম রাসূলকে বলেছিলেন:
ﺇﻧﻬﻢ ﻟﻢ ﻳﻌﺒﺪﻭﻫﻢ؟ ﻓﻘﺎﻝ : ﺑﻠﻰ ، ﺇﻧﻬﻢ ﺣﺮﻣﻮﺍ ﻋﻠﻴﻬﻢ ﺍﻟﺤﻼﻝ ، ﻭﺃﺣﻠﻮﺍ ﻟﻬﻢ ﺍﻟﺤﺮﺍﻡ ، ﻓﺎﺗﺒﻌﻮﻫﻢ ، ﻓﺬﻟﻚ ﻋﺒﺎﺩﺗﻬﻢ ﺇﻳﺎﻫﻢ . ﺍﻟﺘﺰﻣﺬﻱ 3095
“তারা তো তাদের পুজা করে নি। রাসূল (স.) বললেন: হা। তবে তারা আল্লাহ যা হালাল করিছিলেন, তা হারাম বানিয়েছে। আর আল্লাহ যা হারাম বানিয়েছেন, সেগুলোকে তারা হালাল বানিয়েছে। আর সাধারণ জনগণ তা মেনে নিয়েছে। এটাই হচ্ছে ইয়াহুদ-খ্রীস্টান কর্তৃক পুরোহিত পুজা।”।(তিরমিযয়ী:৩০৯৫)।
.
যারা আল্লাহর দ্বীন/শরীয়তের বিপরীত আইন করে এবং যারা তা মেনে নেয় তাদের ব্যাপারে আল্লাহ বলছেন:
ﺃَﻡْ ﻟَﻬُﻢْ ﺷُﺮَﻛَﺎﺀُ ﺷَﺮَﻋُﻮﺍ ﻟَﻬُﻢ ﻣِّﻦَ ﺍﻟﺪِّﻳﻦِ ﻣَﺎ ﻟَﻢْ ﻳَﺄْﺫَﻥ ﺑِﻪِ ﺍﻟﻠَّﻪُ
“তারা কি আল্লাহর সাথে এমন কিছু শরীক বানিয়ে নিয়েছে, যারা তাদের জন্য এমন দ্বীন প্রবর্তন করলো, যে ব্যাপারে আল্লাহর কোন অনুমদোন নেই। (সূরা শুরা, আয়াত: ২১)।
.
এবার আপনি ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে একটি অইসলামিক সরকার ইসলামের বিধিনিষেধ মেনে চলতে বাধা দিবেনা ততটুকু ঠিকই আপনি মেনে চলছেন। যেমন- নামাজ,রোজা,নিজের ইচ্ছেমত পালন করবেন। প্রয়োজন মনে করলে যাকাত দিবেন। আর মনে না করলে যাকাত দিবেন না ও প্রয়োজন মনে করলে হজ্জ করবেন । আর দরকার না হলে হজ্জ করবেন না ইত্যাদি।
কিন্তু মহান আল্লাহর সকল বিধি নিষেধ ও কাজগুলো মোসলমানের ইচ্ছে মোতাবেক করা যাবে না। বরং একটি রাষ্ট্রের সরকার আল কোরআনের আইন চালু করে নামাজ,রোযা,হজ্জ,যাকাত পালন ও আদায়। খুন,ঘুম,ধর্ষণ,চুরি,দূর্ণীতি সহ সকল অপরাধ দমনে আল্লাহ তায়ালার সকল নিদর্শনা সরকারিভাবে বাস্তবায়ন করাই হলো দ্বীন প্রতিষ্ঠা বা ইসলামকে পরিপূর্ণ পালন করা।
সুতারং একটি সমাজ ও রাষ্ট্রের সরকারকে এ সব ইসলামি আইন বাস্তবায়ন করতে আমরা আমাদের জায়গা থেকে বলছিনা বা করার জন্য কাজ করছি না। এমনকি এ কাজ যারা করছে তাদেরকে সার্বিক সহযোগিতা না করে সমাজ ও রাষ্ট্রের সরকারের প্রচলিত মানব রচিত আইন নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে মেনে চলছি । অর্থাৎ সরকারের আইন আদালত আল্লাহর দেয়া আইনে চলছেনা বরং সেখানেত আরেকজনের আইনে চলছে। সে জায়গায়ত তাহলে আল্লাহর সাথে আরেকজনকে শরিক করা হচ্ছে।
মোট কথা আপনার আমার পৃথিবীর জীবনের সর্বজায়গায় আল্লাহর আদেশ নিষেধ মেনে চলা না হলে আমরা পরিপূর্ণ শিরিক মুক্ত হতে পারব না।
তাহলে এখন আমাদের করণীয় কী?
আমাদের করণীয় হলো একক ভাবে ও সংঘবদ্ধ ভাবে ব্যক্তিগত,পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয়ভাবে ও রাষ্ট্রের সকল সেক্টর তথা, রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ে , প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে, সকল মন্ত্রীর কার্যালয় ও আইন আদালতসহ সকল জায়গায় যেন মহান আল্লাহর দেয়া বিধান ও আইন মোতাবেক যাতে চলতে পারে সে জন্য প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে শান্তিপূর্ণ পন্থায় সময় ও অর্থ ব্যয় করে কাজ করা।
এ কাজটি যে সংগঠন বা রাজনৈতিক দল করে থাকে তাদেরকে একজন মুসলামান হিসেবে আমাদের সহযোগিতা করা ও তাদের সাথে থাকা দরকার। হোক সেটা যে কোনো সংগঠন ও দল।
অন্যদিকে যেহেতু এদেশে বর্তমানে গণতান্ত্রিক রাজনীতি আছে বা চলছে সেহেতু আপাদত শান্তিপূর্ণ ভাবে রাজনৈতিক অঙ্গনেও গণতান্ত্রিক পন্থায় কাজ করে রাষ্ট্রীয় ভাবে সরকার গঠনের চেষ্টা করে রাষ্ট্রের সকল সেক্টরে ইসলামি পরিবেশ ও আইন যাতে পাশ করে চালু করা যায় সে চেষ্টা করা।
মহান আল্লাহ আমাদেরকে বুঝার ও আমল করার তাওফিক দিক। আমিন।

ISLAMIC DAWAH FOUNDATION The truth is revealed to Islam