ইনফাক ফি সাবিলিল্লাহ
কুরআন ও হাদিসের আলোকে
السلام عليكم و رحمة الله و بركاته. الحمد لله رب العالمين والصلاه والسلام على اشرف المرسلين وخاتم النبيين ورحمه الله للعالمين سيدنا محمد وعلى اله وصحبه اجمعين. جنة الفردوس للذين ماتوا في سبيل إقامة الدين. أعوذ بالله من الشيطان الرجيم. بسم الله الرحمن الرحيم. رب اشرح لي صدري* ويسر لي أمري* واحلل عقدة من لساني * يفقهوا قولي * اما بعد : فان الله تبارك وتعالى امر عباده بعبادته وحده لا شريك له و قال الله تبارك وتعالى في كتابه المخيد و فركان الحميد .لَنۡ تَنَالُوا الۡبِرَّ حَتّٰی تُنۡفِقُوۡا مِمَّا تُحِبُّوۡنَ
সম্মানিত উপস্থিতি,
আজকের আলোচনার বিষয় “ইনফাক ফি সাবিলিল্লাহ”।
“ইনফাক” অর্থ ব্যয় করা, উৎসর্গ করা, সময় ও সামর্থ্য ব্যয় করা এবং “ফি সাবিলিল্লাহ” অর্থ আল্লাহর পথে। অর্থাৎ আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে নিজের সম্পদ, সময় ও সামর্থ্য ব্যয় করাই হলো ইনফাক ফি সাবিলিল্লাহ।
ইনফাক শুধু টাকা নয়
অনেকেই মনে করেন ইনফাক মানে টাকা দান।
কিন্তু কুরআনে আল্লাহ বলেছেন— সুরা সাবা আয়াত ৩৯
وَ مَاۤ اَنۡفَقۡتُمۡ مِّنۡ شَیۡءٍ فَهُوَ یُخۡلِفُهٗ ۚ
“আর তোমরা যা কিছু ব্যয় করবে, তিনি তার বিনিময় দেবেন
এখানে সময়, শ্রম, দক্ষতা, জ্ঞান, প্রভাব—সবই অন্তর্ভুক্ত।
সুরা তওবা আয়াত ১১১
اِنَّ اللّٰهَ اشۡتَرٰی مِنَ الۡمُؤۡمِنِیۡنَ اَنۡفُسَهُمۡ وَ اَمۡوَالَهُمۡ بِاَنَّ لَهُمُ الۡجَنَّۃَ
নিশ্চয় আল্লাহ মুমিনদের কাছ থেকে তাদের জীবন ও সম্পদ কিনে নিয়েছেন (এর বিনিময়ে) যে, তাদের জন্য আছে জান্নাত
একজন শিক্ষক তার জ্ঞান দিয়ে, একজন লেখক তার কলম দিয়ে, একজন দাঈ তার সময় দিয়ে ইনফাক করতে পারেন।
ইসলামের ইতিহাসে অনেক বড় বিজয় শুরু হয়েছে কয়েকজন দানশীল মানুষের হাত ধরে
খাদিজা (রা.)-এর সম্পদ
আবু বকর (রা.)-এর সম্পদ
উসমান (রা.)-এর সম্পদ
আবদুর রহমান ইবন আউফ (রা.)-এর সম্পদ
এসব সম্পদ শুধু ব্যক্তিগত দান ছিল না; বরং ইসলামী সভ্যতা গঠনের পেছনে শক্তিশালী ভূমিকা রেখেছে।
কুরআনে ‘যাকাত’ শব্দ এসেছে প্রায় ৩২ বার, কিন্তু ‘ইনফাক’ ও ব্যয়-সংক্রান্ত শব্দসমূহ বহুবার এসেছে। কুরআনিক আরবি কর্পাস অনুযায়ী ‘أنفق’ (ব্যয় করা) ধাতুর বিভিন্ন রূপ প্রায় ৬৮ বার ব্যবহৃত হয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে ইসলাম শুধু বাধ্যতামূলক যাকাত নয়, বরং সারাজীবন আল্লাহর পথে ব্যয়ের মানসিকতা গড়ে তুলতে চায়।
হে আল্লাহর গোলামেরা! হে রাসুলের আশিকেরা!
আজ আমরা এমন এক দুনিয়ায় বসে আছি, যেখানে আমাদের ঘরগুলো পাকা হচ্ছে, কিন্তু আমাদের ঈমানের ঘর ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। আমাদের পকেটগুলো টাকার গরমে ভারী হচ্ছে, কিন্তু আমাদের দিলগুলো আল্লাহর ভয়ে শূন্য হয়ে যাচ্ছে। আমরা আজ দুনিয়াকে এমনভাবে জাপটে ধরেছি, যেন এই দুনিয়া ছেড়ে আমাদের কোনোদিন যেতে হবে না!
একটু বুক চাপড়ে নিজেকে প্রশ্ন করুন তো— এই যে সম্পদ আপনি দিন-রাত এক করে রক্ত পানি করে উপার্জন করছেন, এই সম্পদ কি আপনার সাথে কবরে যাবে? আল্লাহর কসম! আপনার কাফনের কাপড়ে কোনো পকেট থাকবে না! আপনি শূন্য হাতে এসেছিলেন, আপনি শূন্য হাতেই ফিরে যাবেন। মাঝখান থেকে আপনার হিসাবের খাতায় শুধু জমা হবে— আপনি আল্লাহর দেওয়া সম্পদ কোথায় খরচ করেছিলেন?
ইনফাকের গুরুত্ব
মানুষ সাধারণত তার সম্পদকে খুব ভালোবাসে। কিন্তু একজন মুমিন জানেন যে, সম্পদ আল্লাহর দান এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ব্যয় করাই প্রকৃত সফলতা।
আল্লাহ বলেন: সুরা বাকারা আয়াত ১৯৫
وَ اَنۡفِقُوۡا فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰهِ وَ لَا تُلۡقُوۡا بِاَیۡدِیۡكُمۡ اِلَی التَّهۡلُكَۃِ ۚۖۛ
আর তোমরা আল্লাহর পথে ব্যয় করা এবং স্বহস্তে নিজেদেরকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিও না
সুরা বাকারা আয়াত ২৫৪
یٰۤاَیُّهَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡۤا اَنۡفِقُوۡا مِمَّا رَزَقۡنٰكُمۡ مِّنۡ قَبۡلِ اَنۡ یَّاۡتِیَ یَوۡمٌ لَّا بَیۡعٌ فِیۡهِ وَ لَا خُلَّۃٌ وَّ لَا شَفَاعَۃٌ ؕ وَ الۡكٰفِرُوۡنَ هُمُ الظّٰلِمُوۡنَ
হে মুমিনগণ! আমরা যা তোমাদেরকে দিয়েছি তা থেকে তোমরা ব্যয় কর সেদিন আসার পূর্বে, যেদিন বেচা-কেনা, বন্ধুত্ব ও সুপারিশ থাকবে না, আর কাফেররাই যালিম
সুরা মুনাফিকুন আয়াত ১০
وَ اَنۡفِقُوۡا مِنۡ مَّا رَزَقۡنٰكُمۡ مِّنۡ قَبۡلِ اَنۡ یَّاۡتِیَ اَحَدَكُمُ الۡمَوۡتُ فَیَقُوۡلَ رَبِّ لَوۡ لَاۤ اَخَّرۡتَنِیۡۤ اِلٰۤی اَجَلٍ قَرِیۡبٍ ۙ فَاَصَّدَّقَ وَ اَكُنۡ مِّنَ الصّٰلِحِیۡنَ
আর আমরা তোমাদেরকে যে রিযিক দিয়েছি তোমরা তা থেকে ব্যয় করবে তোমাদের কারও মৃত্যু আসার আগে। (অন্যথায় মৃত্যু আসলে সে বলবে,) হে আমার রব! আমাকে আরো কিছু কালের জন্য অবকাশ দিলে আমি সাদাকাহ দিতাম ও সৎকর্মপরায়ণদের অন্তর্ভুক্ত হতাম!
সুরা হাদিদ আয়াত ১৮
اِنَّ الۡمُصَّدِّقِیۡنَ وَ الۡمُصَّدِّقٰتِ وَ اَقۡرَضُوا اللّٰهَ قَرۡضًا حَسَنًا یُّضٰعَفُ لَهُمۡ وَ لَهُمۡ اَجۡرٌ كَرِیۡمٌ
নিশ্চয় দানশীল পুরুষগণ ও দানশীল নারীগণ এবং যারা আল্লাহকে উত্তম ঋণ দান করে তাদেরকে দেয়া হবে বহু গুণ বেশী এবং তাদের জন্য রয়েছে সম্মানজনক পুরস্কার।
আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন: সুরা আল ইমরান আয়াত ৯২
لَنۡ تَنَالُوا الۡبِرَّ حَتّٰی تُنۡفِقُوۡا مِمَّا تُحِبُّوۡنَ ۬ؕ
তোমরা যা ভালবাস তা থেকে ব্যয় না করা পর্যন্ত তোমরা কখনো সওয়াব অর্জন করবে না।
আলোচ্য আয়াত নাযিল হওয়ার পর সাহাবিরা প্রত্যেকেই নিজ নিজ সহায় সম্পত্তির প্রতি লক্ষ্য করলেন যে, কোনটি তাদের নিকট সর্বাপেক্ষা প্রিয়। এরপর আল্লাহর পথে তা ব্যয় করার জন্যে তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে আবেদন করতে লাগলেন। মদীনার আনসারগণের মধ্যে আবু তালহা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বেশ ধনী ছিলেন। মসজিদে নববী সংলগ্ন বিপরীত দিকে তার একটি বাগান ছিল, যাতে ‘বীরাহা’ নামে একটি কুপ ছিল। বর্তমানে মসজিদের নববীর বাব আল মাজীদ্দীর বাদশাহ ফাহদ গেট দিয়ে ভিতরে মসজিদে ঢুকার পর পরই সামান্য বাম পার্শ্বে এ স্থানটি পড়ে। পরিচিতির সুবিধার্থে দুই থামের মাঝখানের তিনটি গোল চক্কর দিয়ে তার স্থান নির্দেশ করা আছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাঝে মাঝে এ বাগানে পদার্পণ করতেন এবং বীরহা কুপের পানি পান করতেন। এ কুপের পানি তিনি পছন্দও করতেন।
আবু তালহার এ বাগান অত্যন্ত মূল্যবান, উর্বর এবং তার বিষয়-সম্পত্তির মধ্যে সর্বাপেক্ষা প্রিয় ছিল। আলোচ্য আয়াত নাযিল হওয়ার পর তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমতে হাজির হয়ে বললেনঃ আমার সব বিষয়-সম্পত্তির মধ্যে বীরহা আমার কাছে সর্বাপেক্ষা প্রিয়। আমি এটি আল্লাহর পথে ব্যয় করতে চাই। আপনি যে কাজে পছন্দ করেন, এটি তাতেই খরচ করুন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ বিরাট মুনাফার এ বাগানটি আমার মতে তুমি স্বীয় আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে বন্টন করে দাও। আবু তালহা এ পরামর্শ গ্রহণ করেন।
সাহাবীদের দানের দৃষ্টান্ত
আবু বকর রা:
হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এর জীবনের সবচেয়ে বিখ্যাত এবং ঐতিহাসিক দানের ঘটনাটি ঘটেছিল হিজরি ৯ম সনে (৬৩০ খ্রিষ্টাব্দে) তাবুক যুদ্ধের প্রাক্কালে। এই ঘটনাটি ইসলামের ইতিহাসে আল্লাহর প্রতি অবিচল বিশ্বাস এবং ত্যাগের এক অনন্য ও সর্বোচ্চ দৃষ্টান্ত।
রোমান (বাইজান্টাইন) সাম্রাজ্যের বিশাল বাহিনী মদিনা আক্রমণ করার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। এই খবর পেয়ে রাসূলুল্লাহ (সা.) মুসলিম বাহিনীকে প্রস্তুত হওয়ার নির্দেশ দেন। তবে তখন মদিনায় চলছিল তীব্র খরা ও প্রচণ্ড গরম, যা ইতিহাসে ‘আশরাতুল উসরাহ’ বা কষ্টের সময় নামে পরিচিত। দূরবর্তী মরুভূমির পথ পাড়ি দিয়ে যুদ্ধ করার মতো পর্যাপ্ত রসদ, বাহন এবং অস্ত্র মুসলিম বাহিনীর কাছে ছিল না। এই সংকটময় পরিস্থিতিতে রাসূলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদেরকে আল্লাহর রাস্তায় (ইনফাক ফি সাবিলিল্লাহ) মুক্তহস্তে অর্থ ও সম্পদ দানের বিশেষ আহ্বান জানান।
রাসূল (সা.)-এর এই আহ্বান শুনে হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) মনে মনে ভাবলেন, দান-খয়রাত ও নেক কাজে আবু বকর (রা.) সবসময়ই প্রথম হন এবং তাঁকে কেউ ছাড়িয়ে যেতে পারে না। উমর (রা.) ভাবলেন, “আজ আমার কাছে প্রচুর সম্পদ রয়েছে। যদি কোনোদিন আবু বকরকে নেক কাজে হারিয়ে দেওয়ার সুযোগ থাকে, তবে তা আজই।” এই ভেবে উমর (রা.) অত্যন্ত আনন্দিত হয়ে তাঁর ঘরের মোট সম্পদের নিখুঁত হিসাব করে ঠিক অর্ধেক অংশ নিয়ে রাসূল (সা.)-এর দরবারে হাজির হলেন।
উমর (রা.) যখন তাঁর সম্পদের অর্ধেক এনে নবীজি (সা.)-এর সামনে রাখলেন, তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন:
হে উমর! তোমার পরিবারের জন্য ঘরে কী রেখে এসেছ?” উমর (রা.) উত্তর দিলেন: “হে আল্লাহর রাসূল! আমি আমার সম্পদের ঠিক অর্ধেকটা আমার পরিবারের জন্য রেখে এসেছি এবং বাকি অর্ধেক এখানে নিয়ে এসেছি।”
উমর (রা.)-এর এই ঘটনার কিছুক্ষণ পরই হযরত আবু বকর (রা.) রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর দরবারে এসে পৌঁছালেন। তিনি তাঁর ঘরে থাকা সমস্ত অর্থ-সম্পদ, কাপড়-চোপড় এবং আসবাবপত্র যা কিছু ছিল, সবকিছু একটি কাপড়ে পোটলা বেঁধে নিয়ে এসেছিলেন। তিনি সম্পূর্ণটাই আল্লাহর রাস্তায় সমর্পণ করলেন।
রাসূলুল্লাহ (সা.) আবু বকর (রা.)-কে দেখে স্মিত হাসলেন এবং একই প্রশ্ন করলেন:
“হে আবু বকর! তোমার পরিবারের জন্য ঘরে কী রেখে এসেছ?”
আবু বকর (রা.) অত্যন্ত বিনম্র ও শান্ত কণ্ঠে যে ঐতিহাসিক উত্তর দিয়েছিলেন, তা কিয়ামত পর্যন্ত মুমিনদের জন্য ঈমানের মাপকাঠি হয়ে থাকবে। তিনি উত্তর দিলেন:
“আমি তাদের জন্য আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলকে রেখে এসেছি।” (অর্থাৎ, ঘরের সব সম্পদ নিয়ে এসেছি, আমার পরিবারের জন্য কেবল আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সন্তুষ্টি এবং ভালোবাসাই অবশিষ্ট আছে)।
ইসলামি রেওয়ায়েত ও তাফসীরের কিতাবগুলোতে বর্ণিত আছে, আবু বকর (রা.) যখন তাঁর সবকিছু দান করে দিয়ে একটি সাধারণ চট বা তালি দেওয়া কাপড় পরে রাসূল (সা.)-এর কাছে বসা ছিলেন, তখন ফেরেশতা জিবরাইল (আ.) আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহী নিয়ে আসেন। জিবরাইল (আ.)-এর পরনেও ছিল আবু বকরের মতো তালি দেওয়া কাপড়।
নবীজি (সা.) জিবরাইল (আ.)-কে এই পোশাকের কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, “আজ আসমানের সমস্ত ফেরেশতা আবু বকরের এই ত্যাগের সম্মানে এমন পোশাক পরেছেন।” জিবরাইল (আ.) আরও বলেন, “আল্লাহ তাআলা আবু বকরকে সালাম জানিয়েছেন এবং জিজ্ঞেস করেছেন—আবু বকর কি তাঁর এই দরিদ্রতা বা ত্যাগের অবস্থায় তাঁর রবের ওপর সন্তুষ্ট আছেন?”
এই খবর শুনে আবু বকর (রা.) কেঁদে ফেললেন এবং আবেগঘন কণ্ঠে বারবার বলতে লাগলেন, “আমি আমার রবের ওপর সন্তুষ্ট! আমি আমার রবের ওপর সন্তুষ্ট!”
আব্দুর রহমান ইবনে আউফ
হযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা.) ছিলেন রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর অন্যতম প্রিয় সাহাবি। তিনি ছিলেন মদিনার সবচেয়ে বড় ব্যবসায়ী এবং অন্যতম শ্রেষ্ঠ ধনী। তবে তাঁর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল, তিনি সম্পদ যেভাবে উপার্জন করতেন, আল্লাহর রাস্তায় (ইনফাক ফি সাবিলিল্লাহ) তার চেয়েও দ্রুত গতিতে তা বিলিয়ে দিতেন।
তাঁর জীবনের অত্যন্ত অনুপ্রেরণামূলক দানের ঘটনা নিচে বিস্তারিত দেওয়া হলো:
এটি হযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা.)-এর জীবনের সবচেয়ে ঐতিহাসিক দানের ঘটনা, যা মদিনায় তোলপাড় সৃষ্টি করেছিল।
একবার মদিনায় তীব্র খাদ্য সংকট ও অভাব চলছিল। এমন সময় হঠাৎ একদিন পুরো মদিনা শহর ধূলিঝড়ে অন্ধকার হয়ে গেল এবং এক বিশাল শোরগোল শোনা গেল। উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা.) জিজ্ঞেস করলেন, “মদিনায় এই শোরগোল কিসের?” লোকজনে তাঁকে জানাল, “সিরিয়া থেকে আবদুর রহমান ইবনে আউফের ৭০০ উটের একটি বিশাল বাণিজ্যিক কাফেলা মদিনায় প্রবেশ করেছে, যা গম, আটা ও অন্যান্য খাদ্যশস্যে পরিপূর্ণ।” এই কথা শুনে হযরত আয়েশা (রা.) বললেন, “আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি—আমি আবদুর রহমান ইবনে আউফকে দেখেছি সে হামাগুড়ি দিয়ে (ধীরগতিতে) জান্নাতে প্রবেশ করছে।” (এর কারণ ছিল তাঁর বিপুল সম্পদের হিসাব-নিকাশ)।
কাফেলার সব মালামাল খালাস করার আগেই আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা.)-এর কানে এই হাদিসের কথা পৌঁছায়। তিনি অত্যন্ত ভীত হয়ে পড়েন এবং তৎক্ষণাৎ আম্মাজান আয়েশা (রা.)-এর কাছে ছুটে যান। তিনি বললেন, “আম্মাজান! আপনি কি সত্যিই আল্লাহর রাসূলকে এই কথা বলতে শুনেছেন?” আয়েশা (রা.) বললেন, “হ্যাঁ।”
তখন আবদুর রহমান (রা.) আবেগে কেঁদে ফেললেন এবং দৃঢ় কণ্ঠে বললেন, “আমি আপনাকে সাক্ষী রেখে বলছি, জান্নাতে দ্রুত প্রবেশের আশায় আমি এই ৭০০ উটের পুরো কাফেলা, এর ওপর থাকা সমস্ত খাদ্যশস্য, মালামাল এবং উটগুলোর জিন ও লাগামসহ সবকিছু আল্লাহর রাস্তায় মদিনার গরিব-দুঃখীদের জন্য সদকা করে দিলাম।
আবু আকীল (রা.)-এর এক সা’ খেজুরের দান
তাবুক অভিযানের সময় সাহাবিরা দান করছিলেন। ধনীরা বিপুল পরিমাণ সম্পদ নিয়ে এলেন। তখন একজন দরিদ্র সাহাবি আবু আকীল আল-আনসারী-এর কাছে দান করার মতো কোনো সম্পদ ছিল না। কিন্তু তাঁর হৃদয় ছিল ঈমানে পরিপূর্ণ। তিনি ভাবলেন, “ধনীরা দান করছে, আমিও আল্লাহর পথে কিছু না কিছু দান করব।”
সেই রাতে তিনি একজন শ্রমিকের কাজ নিলেন। তিনি সারা রাত একটি কূপ থেকে পানি তুলে অন্যের বাগানে সেচের কাজ করলেন। কঠোর পরিশ্রমের বিনিময়ে তিনি দুই সা’ খেজুর মজুরি পেলেন।
ভোরবেলা তিনি খেজুর দুটি ভাগ করলেন। এক সা’ পরিবারের জন্য রেখে দিলেন, কারণ তাদেরও খাবারের প্রয়োজন ছিল। আর বাকি এক সা’ খেজুর আল্লাহর পথে দান করার জন্য নিয়ে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে হাজির হলেন।
মুনাফিকরা উপহাস করে বলল, “আল্লাহ কি এই সামান্য খেজুরের মুখাপেক্ষী?”
তখন আল্লাহ তাদের নিন্দা করে আয়াত নাযিল করেন: সূরা আত-তাওবা আয়াত ৭৯
মুমিনদের মধ্যে যারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে সদকা দেয় এবং যারা নিজ শ্রম ছাড়া কিছুই পায় না, তাদেরকে যারা দোষারোপ করে। অতঃপর তারা তাদের নিয়ে উপহাস করে, আল্লাহ তাদেরকে নিয়ে উপহাস করেন; আর তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।
আল্লাহ দানের পরিমাণ দেখেন না, আন্তরিকতা দেখেন।
ইনফাকের প্রতিদান
আল্লাহ তাআলা বলেন: সুরা বাকারা আয়াত ২৬১
“যারা আল্লাহর পথে তাদের সম্পদ ব্যয় করে, তাদের উদাহরণ একটি বীজের মতো, যা সাতটি শীষ উৎপন্ন করে; প্রতিটি শীষে একশত দানা থাকে। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা আরও বৃদ্ধি করে দেন।”
এক টাকা, একশ টাকা বা এক হাজার টাকা—আল্লাহর কাছে পরিমাণ নয়, বরং নিয়ত ও ইখলাস গুরুত্বপূর্ণ।
মুত্তাকি হতে হলে আল্লাহর পথে ব্যয় করতে হবে,
সুরা বাকারা আয়াত ২-৩
ذٰلِكَ الۡكِتٰبُ لَا رَیۡبَ ۚۖۛ فِیۡهِ ۚۛ هُدًی لِّلۡمُتَّقِیۡنَ ۙ
الَّذِیۡنَ یُؤۡمِنُوۡنَ بِالۡغَیۡبِ وَ یُقِیۡمُوۡنَ الصَّلٰوۃَ وَ مِمَّا رَزَقۡنٰهُمۡ یُنۡفِقُوۡنَ ۙ
এটা সে কিতাব; যাতে কোন সন্দেহ নেই, মুত্তাকীদের জন্য হেদায়াত,
যারা গায়েবের প্রতি ঈমান আনে , সালাত কায়েম করে এবং তাদেরকে আমরা যা দান করেছি তা থেকে ব্যয় করে।
হাদিসে রাসূল ﷺ বলেছেন: সহিহ বুখারি, হাদিস ১৪৪২
“প্রতিদিন সকালে দুইজন ফেরেশতা অবতরণ করেন। একজন বলেন, হে আল্লাহ! যে ব্যয় করে তাকে আরও দান করুন। অন্যজন বলেন, হে আল্লাহ! যে কৃপণতা করে তার সম্পদ ধ্বংস করুন।”
কৃপনতা ভয়াবহতা
সুরা আল ইমরান আয়াত ১৮০
وَ لَا یَحۡسَبَنَّ الَّذِیۡنَ یَبۡخَلُوۡنَ بِمَاۤ اٰتٰهُمُ اللّٰهُ مِنۡ فَضۡلِهٖ هُوَ خَیۡرًا لَّهُمۡ ؕ بَلۡ هُوَ شَرٌّ لَّهُمۡ ؕ سَیُطَوَّقُوۡنَ مَا بَخِلُوۡا بِهٖ یَوۡمَ الۡقِیٰمَۃِ ؕ وَ لِلّٰهِ مِیۡرَاثُ السَّمٰوٰتِ وَ الۡاَرۡضِ ؕ وَ اللّٰهُ بِمَا تَعۡمَلُوۡنَ خَبِیۡرٌ
আর আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে যা দিয়েছেন তাতে যারা কৃপণতা করে তাদের জন্য তা মঙ্গল, এমনটি যেন তারা কিছুতেই মনে না করে। বরং তা তাদের জন্য অমঙ্গল। যেটাতে তারা কৃপণতা করবে কেয়ামতের দিন সেটাই তাদের গলায় বেড়ী হবে। আসমান ও যমীনের সত্ত্বাধিকার একমাত্র আল্লাহরই। তোমরা যা কর আল্লাহ্ তা বিশেষভাবে অবহিত।
মৃত্যুর পর মানুষ সবচেয়ে বেশি আফসোস করবে ইনফাক না করার জন্য
সুরা মুনাফিকুন আয়াত ১০
وَ اَنۡفِقُوۡا مِنۡ مَّا رَزَقۡنٰكُمۡ مِّنۡ قَبۡلِ اَنۡ یَّاۡتِیَ اَحَدَكُمُ الۡمَوۡتُ فَیَقُوۡلَ رَبِّ لَوۡ لَاۤ اَخَّرۡتَنِیۡۤ اِلٰۤی اَجَلٍ قَرِیۡبٍ ۙ فَاَصَّدَّقَ وَ اَكُنۡ مِّنَ الصّٰلِحِیۡنَ
আর আমরা তোমাদেরকে যে রিযিক দিয়েছি তোমরা তা থেকে ব্যয় করবে তোমাদের কারও মৃত্যু আসার আগে। (অন্যথায় মৃত্যু আসলে সে বলবে,) হে আমার রব! আমাকে আরো কিছু কালের জন্য অবকাশ দিলে আমি সাদাকাহ দিতাম ও সৎকর্মপরায়ণদের অন্তর্ভুক্ত হতাম!
উপসংহার
ভাবুন, মৃত্যুর পরে আপনার ব্যাংক ব্যালেন্স, জমি, বাড়ি, ব্যবসা—কিছুই সঙ্গে যাবে না। কিন্তু আল্লাহর পথে ব্যয় করা একটি টাকাও হারিয়ে যাবে না। কিয়ামতের দিন যখন মানুষ একটি নেকির জন্য হাহাকার করবে, তখন হয়তো আপনি দেখবেন—একটি মসজিদে দেওয়া অনুদান, একটি কুরআন বিতরণ, একজন দাঈর সহযোগিতা, একটি এতিমের মুখে তুলে দেওয়া খাবার—এসব পাহাড়সম নেকি হয়ে আপনার সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
সাহাবায়ে কেরাম এই সত্য বুঝেছিলেন। তাই Abu Bakr তাবুকের অভিযানে নিজের সব সম্পদ নিয়ে এসেছিলেন। যখন জিজ্ঞেস করা হলো, পরিবারের জন্য কী রেখেছেন? তিনি বললেন, “আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে রেখে এসেছি।” কী অসাধারণ ঈমান! কী গভীর ভালোবাসা!
আজ ইসলাম, দাওয়াত, শিক্ষা, এতিম, অসহায় মানুষ—সবাই আমাদের সহযোগিতার অপেক্ষায়। প্রশ্ন হলো, আল্লাহর পথে ব্যয় করার জন্য আমরা কী অপেক্ষা করছি? সম্পদ বেশি হওয়ার? অবসর সময় আসার? মনে রাখবেন, শয়তান সব সময় বলবে—“আরও পরে দিও, এখন নয়।” কিন্তু মৃত্যু কখনো বলে না—“আমি পরে আসব।”
কবরের মানুষদের যদি পৃথিবীতে ফিরে আসার সুযোগ দেওয়া হতো, তারা ধনী হতে চাইত না, নেতা হতে চাইত না; তারা চাইত আল্লাহর পথে আরও কিছু দান করতে, আরও কিছু ইনফাক করতে।
তাই আসুন, আমরা সংকল্প করি—
আমাদের সম্পদ থেকে ইনফাক করব।
আমাদের সময় থেকে ইনফাক করব।
আমাদের জ্ঞান ও দক্ষতা থেকে ইনফাক করব।
ইসলামের দাওয়াত ও প্রতিষ্ঠার কাজে ইনফাক করব।
কারণ, আল্লাহর পথে ব্যয় করা কখনো ক্ষতি নয়। প্রকৃত ক্ষতি হলো সেই সম্পদ, যা মৃত্যুর পর উত্তরাধিকারীদের কাছে থেকে যাবে কিন্তু আমাদের আমলনামায় কোনো সওয়াব যোগ করবে না।
আজ যে টাকা আপনি আল্লাহর পথে ব্যয় করবেন, কাল সেটিই আপনার জন্য জান্নাতের ছায়া হয়ে দাঁড়াবে।
আজ যে সম্পদ আপনি আঁকড়ে ধরে রাখবেন, কাল সেটিই অন্যের সম্পদ হয়ে যাবে।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে তাঁর পথে উদারভাবে ব্যয় করার তাওফিক দান করুন এবং আমাদের দানকে কবুল করুন।
آمين يا رب العالمين.

ISLAMIC DAWAH FOUNDATION The truth is revealed to Islam