Tuesday , March 10 2026
সর্বশেষ

সুরা আনকাবুত এর ১-১১ নং আয়াতের তাফসির

সুরা আনকাবুত এর ১-১১ নং আয়াতের তাফসির

আনকাবুত শব্দটির অর্থ ‘মাকড়সা’।

নামকরণ :
সূরা আনকাবুতের চতুর্থ রুকুর ৪১ নম্বর আয়াতের আনকাবুত শব্দ হতে এই সূরার নামকরণ করা হয়েছে। সূরার এই নামকরণ করা হয়েছে কোনো শিরোনাম হিসেবে নয়। অন্যান্য সূরার ন্যায় এটিও প্রতীকি নামকরণ। তবে এই নামকরণে অবশ্যই ওহীর নির্দেশ রয়েছে। কেননা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর নিজস্ব কোনো চিন্তা থেকে সূরাসমূহের নামকরণ করেননি।

শানে নুযুল বা অবতরণের কারণ :
মক্কায় মুসলমানদের ওপর চরম নির্যাতন চলছিল। কাফেররা পূর্ণশক্তিতে ইসলামের বিরোধিতা করছিল। যেই ইসলাম কবুল করে রাসূলের (সা) দলে যোগদান করতেন তার ওপরই চরম বিপদ-আপদ ও জুলুম-নির্যাতনের স্টিম রোলার চলতো। এমতাবস্থায় আল্লাহ তা’য়ালা এ সূরাটি নাজিল করেন। এ সূরার মাধ্যমে আল্লাহ তা’য়ালা প্রকৃত নিষ্ঠাবান ঈমানদারদের দৃঢ়সংকল্প, অনড় মনোবল, সাহস-হিম্মত ও অনমনীয় মনোবল সৃষ্টি করতে চেয়েছেন। সাথে সাথে দুর্বল ঈমানদার লোকদেরকে লজ্জা দিতে চেয়েছেন। একই সাথে মক্কার কাফেরদেরকে কঠোর ভাষায় শাসন করা হয়েছে। তাছাড়া অতীতের নবী রাসূলদের ওপর অমানষিক জুলুম নির্যাতনের কাহিনী বর্ণিত হয়েছে এ সূরায়। নির্যাতন সহ্য করে যারা সত্য ঈমানের বলে বলীয়ান হয়ে টিকে ছিলেন আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদেরকে সাহয্য করা হয়েছে। কঠিন পরীক্ষার একটা পর্যায় অতিক্রম করার পরই আল্লাহর সাহায্য আসবে। ঈমানের সেই অগ্নি পরীক্ষা দিয়েই আল্লাহর জান্নাতে যেতে হবে। এ কথাটি মক্কার মুসলমানসহ যুগে যুগে সকল মুমিন মুসলমানদেরকে শিক্ষা দিতেই এ সূরার অবতারণা।

الٓـمّٓ

 اَحَسِبَ النَّاسُ اَنۡ یُّتۡرَکُوۡۤا اَنۡ یَّقُوۡلُوۡۤا اٰمَنَّا وَ هُمۡ لَا یُفۡتَنُوۡنَ

وَ لَقَدۡ فَتَنَّا الَّذِیۡنَ مِنۡ قَبۡلِهِمۡ فَلَیَعۡلَمَنَّ اللّٰهُ الَّذِیۡنَ صَدَقُوۡا وَ لَیَعۡلَمَنَّ الۡکٰذِبِیۡنَ

اَمۡ حَسِبَ الَّذِیۡنَ یَعۡمَلُوۡنَ السَّیِّاٰتِ اَنۡ یَّسۡبِقُوۡنَا ؕ سَآءَ مَا یَحۡکُمُوۡنَ

 مَنۡ کَانَ یَرۡجُوۡا لِقَآءَ اللّٰهِ فَاِنَّ اَجَلَ اللّٰهِ لَاٰتٍ ؕ وَ هُوَ السَّمِیۡعُ الۡعَلِیۡمُ

وَ مَنۡ جَاهَدَ فَاِنَّمَا یُجَاهِدُ لِنَفۡسِهٖ ؕ اِنَّ اللّٰهَ لَغَنِیٌّ عَنِ الۡعٰلَمِیۡنَ

وَ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَ عَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ لَنُکَفِّرَنَّ عَنۡهُمۡ سَیِّاٰتِهِمۡ وَ لَنَجۡزِیَنَّهُمۡ اَحۡسَنَ الَّذِیۡ کَانُوۡا یَعۡمَلُوۡنَ

وَ وَصَّیۡنَا الۡاِنۡسَانَ بِوَالِدَیۡهِ حُسۡنًا ؕ وَ اِنۡ جَاهَدٰکَ لِتُشۡرِکَ بِیۡ مَا لَیۡسَ لَکَ بِهٖ عِلۡمٌ فَلَا تُطِعۡهُمَا ؕ اِلَیَّ مَرۡجِعُکُمۡ فَاُنَبِّئُکُمۡ بِمَا کُنۡتُمۡ تَعۡمَلُوۡنَ    

 وَ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَ عَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ لَنُدۡخِلَنَّهُمۡ فِی الصّٰلِحِیۡنَ

وَ مِنَ النَّاسِ مَنۡ یَّقُوۡلُ اٰمَنَّا بِاللّٰهِ فَاِذَاۤ اُوۡذِیَ فِی اللّٰهِ جَعَلَ فِتۡنَۃَ النَّاسِ کَعَذَابِ اللّٰهِ ؕ وَ لَئِنۡ جَآءَ نَصۡرٌ مِّنۡ رَّبِّکَ لَیَقُوۡلُنَّ اِنَّا کُنَّا مَعَکُمۡ ؕ اَوَ لَیۡسَ اللّٰهُ بِاَعۡلَمَ بِمَا فِیۡ صُدُوۡرِ الۡعٰلَمِیۡنَ

وَ لَیَعۡلَمَنَّ اللّٰهُ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَ لَیَعۡلَمَنَّ الۡمُنٰفِقِیۡنَ 

অর্থঃ আলিফ-লাম-মীম, মানুষ কি মনে করেছে যে, আমরা ঈমান এনেছি এ কথা বললেই তাদেরকে পরীক্ষা না করে অব্যাহতি দেয়া হবে?, আর অবশ্যই আমরা এদের পূৰ্ববতীদেরকেও পরীক্ষা করেছিলাম অতঃপর আল্লাহ অবশ্যই প্রকাশ করে দেবেন কারা সত্যবাদী এবং তিনি অবশ্যই প্রকাশ করে দেবেন কারা মিথ্যাবাদী, তবে কি যারা মন্দকাজ করে তারা মনে করে যে, তারা আমাদের আয়ত্তের বাইরে চলে যাবে? তাদের সিদ্ধান্ত কত মন্দ!, যে আল্লাহর সাক্ষাত কামনা করে সে জেনে রাখুক আল্লাহর নির্ধারিত সময় আসবেই আর তিনি তো সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ, আর যে কেউ প্রচেষ্টা চালায়, সে তো নিজের জন্যই প্রচেষ্টা চালায় আল্লাহ তো সৃষ্টিকুল থেকে অমুখাপেক্ষী, আর যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকাজ করেছে আমরা অবশ্যই তাদের থেকে তাদের মন্দকাজগুলো মিটিয়ে দেব এবং আমরা অবশ্যই তাদেরকে তারা যে উত্তম কাজ করত তার প্রতিদান দেব, আর আমরা মানুষকে নির্দেশ দিয়েছি তার পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করতে তবে তারা যদি তোমার উপর বল প্রয়োগ করে আমার সাথে এমন কিছু শরীক করতে যার সম্পর্কে তোমার কোন জ্ঞান নেই তাহলে তুমি তাদেরকে মেনো না আমারই কাছে তোমাদের ফিরে আসা অতঃপর তোমরা কি করছিলে তা আমি তোমাদেরকে জানিয়ে দেব, আর যারা ঈমান আনে ও সৎকাজ করে আমরা অবশ্যই তাদেরকে সৎকর্মপরায়ণদের অন্তর্ভুক্ত করব, আর মানুষের মধ্যে কেউ কেউ বলে, আমরা আল্লাহর উপর ঈমান এনেছি কিন্তু আল্লাহর পথে যখন তারা নিগৃহীত হয়, তখন তারা মানুষের পীড়নকে আল্লাহর শাস্তির মত গণ্য করে আর আপনার রবের কাছ থেকে কোন সাহায্য আসলে তারা বলতে থাকে, আমরা তো তোমাদের সঙ্গেই ছিলাম সৃষ্টিকুলের অন্তঃকরণে যা আছে, আল্লাহ কি তা সম্যক অবগত নন, আর আল্লাহ অবশ্যই প্রকাশ করে দিবেন কারা ঈমান এনেছে এবং অবশ্যই প্রকাশ করে দিবেন কারা মুনাফিক।

তাফসির

আয়াত নং-০১

الٓـمّٓ

১. আলিফ-লাম-মীম

এই গুলোকে হুরুফে মুকাত্তা‘আত বলে। হুরুফে মুকাত্তা‘আত অর্থ হচ্ছে কর্তিত, খণ্ডিত বা বিচ্ছিন্ন অক্ষর গুচ্ছ। এই গুলোর কোন তাৎপর্য মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তুলে ধরেন নি। অতএব এই গুলো সম্পর্কে নিরব থাকাই আমাদের কর্তব্য।

আয়াত নং-০২

اَحَسِبَ النَّاسُ اَنۡ یُّتۡرَکُوۡۤا اَنۡ یَّقُوۡلُوۡۤا اٰمَنَّا وَ هُمۡ لَا یُفۡتَنُوۡنَ

অর্থঃ মানুষ কি মনে করেছে যে, আমরা ঈমান এনেছি এ কথা বললেই তাদেরকে পরীক্ষা না করে অব্যাহতি দেয়া হবে

يُفْتَنُون  শব্দটি فتنة  থেকে উদ্ভূত। এর অর্থ পরীক্ষা। ঈমানদার বিশেষত: নবীগণকে এ জগতে বিভিন্ন প্রকার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়েছে। পরিশেষে বিজয় ও সাফল্য তাদেরই হাতে এসেছে। এসব পরীক্ষা জান ও মালের উপর ছিল। 

আল্লাহ তায়ালা বলেছেন- সুরা কাহফ এর ০৭ নং আয়াত

 اِنَّا جَعَلۡنَا مَا عَلَی الۡاَرۡضِ زِیۡنَۃً لَّهَا لِنَبۡلُوَهُمۡ اَیُّهُمۡ اَحۡسَنُ عَمَلًا

নিশ্চয় যমীনের উপর যা কিছু আছে আমরা সেগুলোকে তার শোভা করেছি, মানুষকে এ পরীক্ষা করার জন্য যে, তাদের মধ্যে কাজে কে শ্ৰেষ্ঠ

আল্লাহ তায়ালা আরো বলেছেন, সুরা মুলকের ০২ নং আয়াত

الَّذِیۡ خَلَقَ الۡمَوۡتَ وَ الۡحَیٰوۃَ لِیَبۡلُوَکُمۡ اَیُّکُمۡ اَحۡسَنُ عَمَلًا ؕ وَ هُوَ الۡعَزِیۡزُ الۡغَفُوۡرُ

যিনি সৃষ্টি করেছেন মৃত্যু ও জীবন, তোমাদেরকে পরীক্ষা করার জন্যকে তোমাদের মধ্যে আমলের দিক থেকে উত্তম? তিনি পর্যক্রমশালী, ক্ষমাশীল

আয়াত নং-০৩

وَ لَقَدۡ فَتَنَّا الَّذِیۡنَ مِنۡ قَبۡلِهِمۡ فَلَیَعۡلَمَنَّ اللّٰهُ الَّذِیۡنَ صَدَقُوۡا وَ لَیَعۡلَمَنَّ الۡکٰذِبِیۡنَ

আর অবশ্যই আমরা এদের পূৰ্ববতীদেরকেও পরীক্ষা করেছিলাম; অতঃপর আল্লাহ অবশ্যই প্রকাশ করে দেবেন কারা সত্যবাদী এবং তিনি অবশ্যই প্রকাশ করে দেবেন কারা মিথ্যাবাদী।

মূল শব্দ হচ্ছে لَيَعْلَمَنَّ এর শাব্দিক অনুবাদ হবে, “আল্লাহ অবশ্যই জেনে নেবেন”। অর্থাৎ এসব পরীক্ষা ও বিপদাপদের মাধ্যমে আল্লাহ তা’আলা খাঁটি-অখাঁটি এবং সৎ ও অসাধুর মধ্যে অবশ্যই পার্থক্য ফুটিয়ে তুলবেন। কেননা, খাঁটিদের সাথে কপট বিশ্বাসীদের মিশ্রণের ফলে মাঝে মাঝে বিরাট ক্ষতিসাধিত হয়ে যায়। [মুয়াসসার] আলোচ্য আয়াতের উদ্দেশ্য সৎ, অসৎ এবং খাঁটি-অখাঁটি পার্থক্য ফুটিয়ে তোলা। একে এভাবে ব্যক্ত করা হয়েছে যে, আল্লাহ্ তা’আলা জেনে নেবেন কারা সত্যবাদী এবং কারা মিথ্যাবাদী। প্রত্যেক মানুষের সত্যবাদিতা ও মিথ্যাবাদিতা তার জন্মের পূর্বেই আল্লাহ্ তা’আলার জানা রয়েছে। তবুও পরীক্ষার মাধ্যমে জানার অর্থ এই যে, এই পার্থক্যকে অপরাপর লোকদের কাছেও প্রকাশ করে দেবেন।

আয়াত নং-০৪

اَمۡ حَسِبَ الَّذِیۡنَ یَعۡمَلُوۡنَ السَّیِّاٰتِ اَنۡ یَّسۡبِقُوۡنَا ؕ سَآءَ مَا یَحۡکُمُوۡنَ

তবে কি যারা মন্দকাজ করে তারা মনে করে যে, তারা আমাদের আয়ত্তের বাইরে চলে যাবে? তাদের সিদ্ধান্ত কত মন্দ!

মূল শব্দ হচ্ছে سابق  অর্থাৎ আমার থেকে এগিয়ে যাবে। আয়াতের এ অর্থও হতে পারে, “আমার পাকড়াও এড়িয়ে অন্য কোথাও পালিয়ে যেতে পারবে।” অপর অর্থ হচ্ছে, তারা কি মনে করে যে, তাদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ও গোনাহসমূহ এমনিতেই ছেড়ে দেয়া হবে? তারা কি মনে করে যে, আল্লাহ এগুলো থেকে উদাসীন হয়ে যাবেন? আর এজন্যই কি তারা অপরাধগুলো করে যাচ্ছে?

আয়াত নং-০৫

 مَنۡ کَانَ یَرۡجُوۡا لِقَآءَ اللّٰهِ فَاِنَّ اَجَلَ اللّٰهِ لَاٰتٍ ؕ وَ هُوَ السَّمِیۡعُ الۡعَلِیۡمُ

যে আল্লাহর সাক্ষাত কামনা করে সে জেনে রাখুক, আল্লাহর নির্ধারিত সময় আসবেই। আর তিনি তো সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ

যে ব্যক্তি আখেরাতের জীবনে বিশ্বাসই করে না এবং মনে করে, কারো সামনে নিজের কাজের জবাবদিহি করতে হবে না এবং এমন কোন সময় আসবে না যখন নিজের জীবনের যাবতীয় কাজের কোন হিসেবা-নিকেশ দিতে হবে, তার কথা আলাদা। সে নিজের গাফলতির মধ্যে পড়ে থাকুক এবং নিশ্চিন্তে যা করতে চায় করে যাক।

তবে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, সুরা মুমিনুন আয়াত-১৬

ثُمَّ اِنَّکُمۡ یَوۡمَ الۡقِیٰمَۃِ تُبۡعَثُوۡنَ

তারপর কেয়ামতের দিন নিশ্চয় তোমাদেরকে উত্থিত করা হবে।

নিজের আন্দাজ-অনুমানের বিপরীত নিজের পরিণাম সে নিজেই দেখে নেবে। কিন্তু যারা আশা রাখে, এক সময় তাদেরকে তাদের মা’বুদের সামনে হাজির হতে হবে এবং নিজের কর্ম অনুযায়ী পুরস্কার ও শাস্তি পেতে হবে, তাদের এ ভুল ধারণায় ডুবে থাকা উচিত নয় যে, মৃত্যুর সময় অনেক দূরে৷ তাদের তো মনে করা উচিত, সে সময় অতি নিকটেই এসে গেছে এবং কাজের অবকাশ খতম হবারই পথে। তাই নিজের শুভ পরিণামের জন্য তারা যা কিছু করতে চায় করে ফেলুক। দীর্ঘ জীবন-কালের ভিত্তিহীন নির্ভরতার ওপর ভরসা করে নিজের সংশোধনে বিলম্ব করা উচিত নয়। অন্য আয়াতে আল্লাহ তা’আলা বলেন, সুরা কাহাফ আয়াত-১১০

فَمَنۡ کَانَ یَرۡجُوۡا لِقَآءَ رَبِّهٖ فَلۡیَعۡمَلۡ عَمَلًا صَالِحًا وَّ لَا یُشۡرِکۡ بِعِبَادَۃِ رَبِّهٖۤ اَحَدًا 

কাজেই যে তার রব-এর সাক্ষাত কামনা করে, সে যেন সৎকাজ করে ও তার রব-এর ইবাদাতে কাউকেও শরীক না করে

আয়াত নং-০৬

وَ مَنۡ جَاهَدَ فَاِنَّمَا یُجَاهِدُ لِنَفۡسِهٖ ؕ اِنَّ اللّٰهَ لَغَنِیٌّ عَنِ الۡعٰلَمِیۡنَ

আর যে কেউ প্রচেষ্টা চালায়, সে তো নিজের জন্যই প্রচেষ্টা চালায়; আল্লাহ তো সৃষ্টিকুল থেকে অমুখাপেক্ষী

অর্থাৎ আল্লাহ এ জন্য তোমাদের কাছে এ দ্বন্দ্ব-সংগ্রামের দাবী করছেন না যে, নিজের সার্বভৌম কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করার ও প্রতিষ্ঠিত রাখার জন্য তোমাদের সাহায্যের প্রয়োজন, বরং এটিই তোমাদের উন্নতি ও অগ্রগতির পথ, তাই তিনি তোমাদের এ দ্বন্দ্ব-সংগ্রামে লিপ্ত হবার নির্দেশ দিচ্ছেন। এ পথে অগ্রসর হয়ে তোমরা এমন শক্তির অধিকারী হতে পারো যার ফলে দুনিয়ায় তোমরা কল্যাণ ও সুকৃতির ধারক এবং আখেরাতে আল্লাহর জান্নাতের অধিকারী হবে। এ যুদ্ধ চালিয়ে তোমরা আল্লাহর কোন উপকার করবে না বরং তোমরা নিজেরাই উপকৃত হবে। তাছাড়া এ প্রচেষ্টার মাধ্যমে তোমরা আল্লাহর সে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পার যার কথা সূরার শুরুতে আল্লাহ উল্লেখ করেছেন।

সুরা ইখলাসে ০২ নং আয়াতে উল্লেখ আছে

اَللّٰهُ الصَّمَدُ

আল্লাহ অমুখাপেক্ষী

আয়াত নং-০৭

وَ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَ عَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ لَنُکَفِّرَنَّ عَنۡهُمۡ سَیِّاٰتِهِمۡ وَ لَنَجۡزِیَنَّهُمۡ اَحۡسَنَ الَّذِیۡ کَانُوۡا یَعۡمَلُوۡنَ

আর যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকাজ করেছে আমরা অবশ্যই তাদের থেকে তাদের মন্দকাজগুলো মিটিয়ে দেব এবং আমরা অবশ্যই তাদেরকে তারা যে উত্তম কাজ করত, তার প্রতিদান দেব।

আয়াতে ঈমান ও সৎকাজের দু’টি ফল। বৰ্ণনা করা হয়েছে, এক: মানুষের দুস্কৃতি ও পাপগুলো তার থেকে দূর করে দেয়া হবে। দুই: তার সর্বোত্তম কাজসমূহের সর্বোত্তম পুরষ্কার তাকে দেয়া হবে। পাপ ও দুস্কৃতি দূর করে দেয়ার অর্থ সৎকাজের কারণে গোনাহ ক্ষমা পেয়ে যাওয়া। কারণ সৎ কাজ সাধারণ গোনাহ মিটিয়ে দেয়। 

আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, সুরা আনআম-১৬০

 مَنۡ جَآءَ بِالۡحَسَنَۃِ فَلَهٗ عَشۡرُ اَمۡثَالِهَا

কেউ কোন সৎকাজ করলে সে তার দশ গুণ পাবে

আয়াত নং-০৮

وَ وَصَّیۡنَا الۡاِنۡسَانَ بِوَالِدَیۡهِ حُسۡنًا ؕ وَ اِنۡ جَاهَدٰکَ لِتُشۡرِکَ بِیۡ مَا لَیۡسَ لَکَ بِهٖ عِلۡمٌ فَلَا تُطِعۡهُمَا ؕ اِلَیَّ مَرۡجِعُکُمۡ فَاُنَبِّئُکُمۡ بِمَا کُنۡتُمۡ تَعۡمَلُوۡنَ    

আর আমরা মানুষকে নির্দেশ দিয়েছি তার পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করতে। তবে তারা যদি তোমার উপর বল প্রয়োগ করে আমার সাথে এমন কিছু শরীক করতে যার সম্পর্কে তোমার কোন জ্ঞান নেই, তাহলে তুমি তাদেরকে মেনো না আমারই কাছে তোমাদের ফিরে আসা। অতঃপর তোমরা কি করছিলে তা আমি তোমাদেরকে জানিয়ে দেব।

আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লহু আনহু বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করলাম, আল্লাহর কাছে সবচেয়ে উত্তম আমল কোনটি? তিনি বললেন; সময়মত সালাত আদায় করা। বললঃ তারপর কোনটি? তিনি বললেনঃ পিতামাতার প্রতি সদ্ব্যবহার। বললঃ তারপর কোনটি? তিনি বললেনঃ আল্লাহর পথে জিহাদ। [বুখারী: ৫৯৭০]

شرك শিরক শব্দের অর্থ : অংশীদারিত্ব, অংশীবাদ, মিলানো, সমকক্ষ করা, সমান করা, ভাগাভাগি করা ইত্যাদি। ইংরেজীতে polytheism (একাধিক উপাস্যে বিশ্বাস), Associate, Partner

শিরকের সংজ্ঞায় আল্লামা ইবনুল ক্বাইয়িম (রহঃ) বলেছেন, ‘শিরক হ’ল আললাহ তা‘আলার সাথে অন্য কাউকে আল্লাহর সমকক্ষ গ্রহণ করা এবং আল্লাহ তা‘আলার মত তাকে ভালবাসা’।

শিরকের প্রকারভেদ : শিরক দুই প্রকার-

১.- الشرك الاكبر বড় শিরক

২. الشرك الاصغر- ছোট শিরক

لاكبر বা সবচেয়ে বড় শিরক :

বড় শিরক হ’ল  আল্লাহর কোন সমকক্ষ স্থির করে ইবাদতের কোন এক প্রকার আল্লাহ তা‘আলা ব্যতীত অন্যের জন্য করা। যেমন, আল্লাহ তা‘আলা ব্যতীত অন্যের কাছে দো‘আ করা, সিজদা করা, মানত করা, অন্যকে ডাকা, অন্যের নিকট সাহায্যে প্রার্থনা করা মৃত ব্যক্তি, জ্বিন কিংবা শয়তানের প্ররোচনাকে ভয় করা। যেমন, মূর্তি, জ্বিন এর নিকট সাহায্য চাওয়া অথবা কবরের নিকট সন্তান চাওয়া, অলী-আওলিয়ার নিকট সাহায্য চাওয়া যাতে তারা আল্লাহর নিকটবর্তী করে দিবে।

২. ছোট শিরক :

যে সব কথা ও কাজের মাধ্যমে মানুষ শিরকের দিকে ধাবিত হয়ে অর্থাৎ আমলের কাঠামো ও মুখের কথায় আল্লাহ তা‘আলা ব্যতীত অন্যকে আল্লাহর সমকক্ষ সাব্যস্ত করা, সেইরূপ কথা ও কাজকে ছোট শিরক বলা হয়। যেমন সৃষ্টির ব্যাপারে এমনভাবে সীমালংঘন করা যা ইবাদতের পর্যায়ে পৌঁছে যায়। ছোট শিরক মানুষক মুসলিম মিল্লাত থেকে বের করে না তবে তাওহীদের ঘাটতি করে। আর ছোট শিরক বড় শিরকের একটি মাধ্যম। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, إِنَّ أَخْوَفَ مَا أَخَافُ عَلَيْكُمُ الشِّرْكُ الأَصْغَرُ. قَالُوا وَمَا الشِّرْكُ الأَصْغَرُ يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ الرِّيَاءُ  ‘আমি তোমাদের জন্য যে জিনিসটি সবচেয়ে বেশী ভয় করি, তা হচ্ছে শিরকে আছগার বা ছোট শিরক। তাঁকে শিরকে আছগার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি উত্তরে বললেন, রিয়া বা লৌকিকতা’

সুরা মায়েদা আয়াত ৭২

اِنَّهٗ مَنۡ یُّشۡرِکۡ بِاللّٰهِ فَقَدۡ حَرَّمَ اللّٰهُ عَلَیۡهِ الۡجَنَّۃَ وَ مَاۡوٰىهُ النَّارُ

নিশ্চয় কেউ আল্লাহর সাথে শরীক করলে আল্লাহ তার জন্য জান্নাত অবশ্যই হারাম করে দিয়েছেন

শিরক সম্পর্কে আরো উল্লেখ আছে সুরা নেসা-৪৮, ১৭১ নং আয়াত

সুরা লোকমান- ১৩ নং আয়াতে বলা হয়েছে, লোকমান হেকিম তার প্রিয় সন্তানের ছোট বেলায় তাকে কি সুন্দর উপদেশ দিয়েছেন। তার কথা আল্লাহ তায়ালার পছন্দ হয়েছে। তাই আল্লাহ পবিত্র কুরআনে তার কথা নোট করে দিয়েছেন। আমরা আমাদের সন্তানদেরকে দুনিয়ার বিভিন্ন কাজের উপদেশ দিয়ে থাকি, কিন্তু আল্লাহ পছন্দ করবে এমন উপদেশ কয়জনে দিয়ে থাকি? লোকমান হেকিম বলেছেন- 

وَ اِذۡ قَالَ لُقۡمٰنُ لِابۡنِهٖ وَ هُوَ یَعِظُهٗ یٰبُنَیَّ لَا تُشۡرِکۡ بِاللّٰهِ ؕؔ اِنَّ الشِّرۡکَ لَظُلۡمٌ عَظِیۡمٌ

“যখন লুকমান উপদেশ দিতে গিয়ে তার পুত্ৰকে বলেছিল হে আমার প্রিয় বৎস! আল্লাহর সাথে কোন শির্ক করো না। নিশ্চয় শির্ক বড় যুলুম”

আয়াত নং-০৯

 وَ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَ عَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ لَنُدۡخِلَنَّهُمۡ فِی الصّٰلِحِیۡنَ

আর যারা ঈমান আনে ও সৎকাজ করে আমরা অবশ্যই তাদেরকে সৎকর্মপরায়ণদের অন্তর্ভুক্ত করব

যারা ঈমান আনে ও সৎকাজ করে তাদের জন্য রয়েছে পুরুকাস্কার, আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, সুরা বাকারার-৮২ নং আয়াতে

وَ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَ عَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ اُولٰٓئِکَ اَصۡحٰبُ الۡجَنَّۃِ ۚ هُمۡ فِیۡهَا خٰلِدُوۡنَ

আর যারা ঈমান এনেছে ও সৎকাজ করেছে তারাই জান্নাতবাসী, তারা সেখানে স্থায়ী হবে

আয়াত নং-১০

وَ مِنَ النَّاسِ مَنۡ یَّقُوۡلُ اٰمَنَّا بِاللّٰهِ فَاِذَاۤ اُوۡذِیَ فِی اللّٰهِ جَعَلَ فِتۡنَۃَ النَّاسِ کَعَذَابِ اللّٰهِ ؕ وَ لَئِنۡ جَآءَ نَصۡرٌ مِّنۡ رَّبِّکَ لَیَقُوۡلُنَّ اِنَّا کُنَّا مَعَکُمۡ ؕ اَوَ لَیۡسَ اللّٰهُ بِاَعۡلَمَ بِمَا فِیۡ صُدُوۡرِ الۡعٰلَمِیۡنَ

আর মানুষের মধ্যে কেউ কেউ বলে, আমরা আল্লাহর উপর ঈমান এনেছি, কিন্তু আল্লাহর পথে যখন কষ্ট দেওয়া হয়, তখন তারা মানুষের পীড়নকে আল্লাহর শাস্তির মত গণ্য করে। আর আপনার রবের কাছ থেকে কোন সাহায্য আসলে তারা বলতে থাকে, আমরা তো তোমাদের সঙ্গেই ছিলাম সৃষ্টিকুলের অন্তঃকরণে যা আছে, আল্লাহ কি তা সম্যক অবগত নন?

এখানে মুনাফিক ও দুর্বল ঈমানের লোকদের অবস্থা বর্ণনা করা হচ্ছে যে, যখন ঈমান আনার কারণে কোন আপদ-বিপদ আসে, তখন তা আল্লাহর আযাবের মতই তাদের অসহনীয় হয়ে ওঠে। যার ফলে সে ঈমান হতে ফিরে যায় এবং সাধারণের ধর্মকে বেছে নেয়। অর্থাৎ, যদি মুসলিমরা বিজয় ও আধিপত্য লাভ করে তখন তারা বলে আমরা তোমাদের দ্বীনী ভাই।

অন্যত্রে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, সুরা নিসা-১৪১

যারা তোমাদের অমঙ্গলের প্রতীক্ষায় থাকে, তারা আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমাদের জয় হলে বলে, আমরা কি তোমাদের সাথে ছিলাম না। আর যদি কাফেরদের কিছু বিজয় হয়, তবে তারা বলে, আমরা কি তোমাদের বিরুদ্ধে প্রবল ছিলাম না এবং আমরা কি তোমাদেরকে মুমিনদের হাত থেকে রক্ষা করিনি(১)? আল্লাহ কেয়ামতের দিন তোমাদের মধ্যে বিচার মীমাংসা করবেন এবং আল্লাহ কখনই মুমিনদের বিরুদ্ধে কাফেরদের জন্য কোন পথ রাখবেন না

আয়াত নং-১১

وَ لَیَعۡلَمَنَّ اللّٰهُ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَ لَیَعۡلَمَنَّ الۡمُنٰفِقِیۡنَ 

আর আল্লাহ অবশ্যই প্রকাশ করে দিবেন কারা ঈমান এনেছে এবং অবশ্যই প্রকাশ করে দিবেন কারা মুনাফিক

আয়াতের শাব্দিক অনুবাদ হচ্ছে, আল্লাহ অবশ্যই জানবেন কারা ঈমান এনেছে, আর অবশ্যই জানবেন কারা মুনাফিক। আল্লাহর এ জানার অর্থ প্রকাশ করে দেয়া। যাতে করে মুমিনদের ঈমান ও মুনাফিকদের মুনাফিকির অবস্থা যাতে উন্মুক্ত হয়ে যায় এবং যার মধ্যে যা কিছু লুকিয়ে আছে সব সামনে এসে যায় সে জন্য আল্লাহ বারবার পরীক্ষার ব্যবস্থা করেন। 

আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, সুরা মুহাম্মদের-৩১ নং আয়াতে

 وَ لَنَبۡلُوَنَّکُمۡ حَتّٰی نَعۡلَمَ الۡمُجٰهِدِیۡنَ مِنۡکُمۡ وَ الصّٰبِرِیۡنَ ۙ وَ نَبۡلُوَا۠ اَخۡبَارَکُمۡ

আর আমরা অবশ্যই তোমাদেরকে পরীক্ষা করব, যতক্ষণ না আমরা জেনে নেই তোমাদের মধ্যে জিহাদকারী ও ধৈর্যশীলদেরকে এবং আমরা তোমাদের কর্মকাণ্ড পরীক্ষা করি

শিক্ষা

১। আল্লাহ তায়ালা আমাদের পরীক্ষা করবেন যাতে তিনি সত্যবাদী ও মিথ্যাবাদী পার্থক্য করতে পারেন।

২। প্রত্যেকে তার সকল কাজ নিজের জন্য করে।

৩। পিতা মাতার সাথে সদাচারন করা ফরয।

৪। ইমানদারের জন্য পুরুষ্কারের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

৫। মুনাফিকরা বিপদে ধর্য্যধারন না করে অন্যকে দোষারোপ করে।

About Md Nazmul Azam

I am website developer.

Check Also

সুরা আল ইমরান আয়াত ১০২ এর তাফসীর, ঈমান ও মুত্তাকী সম্পর্কে আলোচনা (নাজমুল আযম শামীম)

Download WordPress ThemesDownload WordPress Themes FreePremium WordPress Themes DownloadDownload WordPress Themes Freelynda course free downloaddownload …

দ্বীন প্রতিষ্ঠা (নাজমুল আযম শামীম)

Free Download WordPress ThemesPremium WordPress Themes DownloadDownload Premium WordPress Themes FreeDownload WordPress Themesdownload udemy paid …

সুরা বাকারা এর ১৭৭ নং আয়াতের দারস (তাফসির)

সুরা বাকারা এর ১৭৭ নং আয়াতের দারস (তাফসির)  لَیۡسَ الۡبِرَّ اَنۡ تُوَلُّوۡا وُجُوۡهَكُمۡ قِبَلَ الۡمَشۡرِقِ …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *